ইসলামে সকল বৈধ শ্রম ও পেশাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। শ্রমিকের অধিকার ও হককে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। পৃথিবীর কোথাও বা কোনো ধর্মে শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো বর্ণনা নেই। আধুনিক মানবাধিকারের ধারণা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে ১৯৪৫ সালে প্রণীত জাতিসংঘ সনদে। কিন্তু আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে শ্রমিকের অধিকারের প্রশ্নে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। স্বয়ং মহানবি (সা.) নিজেও একসময় শ্রমিক হিসাবে কাজ করেছেন। তিনি সারা জীবন শ্রমজীবী মানুষের মতো জীবনযাপন করেছেন।
শ্রমের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “মানুষ তা-ই পাবে, যার জন্য সে চেষ্টা করে। আর তার কর্ম অচিরেই তাকে দেখানো হবে। অতঃপর তাকে দেওয়া হবে পূর্ণ প্রতিদান।” (সুরা নাজম : ৩৯-৪১)
শ্রম নবি-রাসুলগণের সুন্নাত
শ্রম ও চেষ্টা ছাড়া কোনো ব্যক্তি আল্লাহর নিকট প্রিয় হতে পারে না। এমনকি বলা যায়, শ্রমনির্ভর পেশা অবলম্বন করা নবি গণের সুন্নাত। প্রত্যেক নবি কায়িক শ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করেছেন। হযরত আদম (আ.) কৃষিকাজ করতেন। দাউদ (আ.) বর্ম তৈরি করতেন। নুহ (আ.) কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। ইদরিস (আ.) সেলাইয়ের কাজ করতেন। মুসা (আ.) রাখালির কাজ করতেন। জাকারিয়া (আ.) সুতার ছিলেন। ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) নির্মাণকাজ করেছেন। নবি করীম (সা.) পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কাজ নিজের হাতে করতেন। তিনি গৃহস্থালির কাজে স্ত্রীদের সাহায্য করতেন, ছেঁড়া কাপড়ে তালি লাগাতেন, ঘরদোর ঝাড়– দিতেন, গৃহপালিত প্রাণীর দুধ দোহন করতেন, বাজার থেকে সওদা বহন করে আনতেন, বালতি মেরামত করতেন, কোথাও সফরকালে সাহাবীদের মাঝে কাজ বণ্টন করা হলে তিনি নিজেও সহযোগিতা করতেন।
কুরআন-হাদিস ও ইসলামের ইতিহাস পড়লে জানা যায়, নবি -রাসুলগণ শ্রমিকদের কত মর্যাদা দিয়েছেন। ইসলামের সব নবি ছাগল চরিয়ে নিজে শ্রমিক হয়ে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। মালিক শুয়াইব (আ.) তাঁর মেয়ের বিয়ে দিয়ে শ্রমিক নবি মুসা (আ.)-কে জামাই বানিয়েছেন। মুহাম্মাদ (সা.) শ্রমিক যায়েদ (রা.)-এর কাছে আপন ফুফাতো বোন যয়নব (রা.)-কে বিয়ে দিয়েছিলেন। যায়েদ (রা.)-কে মুতার যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বানানো হয়েছিল শ্রমিক বেলাল (রা.)-কে। মক্কা বিজয়ের পর কাবাঘরে প্রথম প্রবেশের সময় মহানবি (সা.) শ্রমিক বেলাল ও খাব্বাব (রা.)-কে সাথে রেখেছিলেন। নবিজি কখনও নিজ খাদেম আনাস (রা.)-কে ধমক দেননি, কখনও কটুবাক্য উচ্চারণ করেননি; এমনকি কৈফিয়তও তলব করেননি। নবি করীম (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.) নিজ হাতে জাঁতা ঘোরাতেন। আর এ জন্য তাঁর হাতে জাঁতা ঘোরানোর দাগ পড়েছিল। তিনি নিজেই পানির মশক বয়ে আনতেন, এতে তাঁর বুকে দড়ির দাগ পড়েছিল।
বারা ইবনে আযিব (রা.) বলেন, ‘আমি খন্দক যুদ্ধের দিন দেখেছি, রাসুল (সা.) নিজে মাটি বহন করেছেন আর ধুলায় তাঁর বুকের পশমগুলো ঢাকা পড়েছিল।’ (বুখারী : ৩০৩৪)।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বর্ণনা করেন, “আল্লাহ তায়ালা এমন কোনো নবি প্রেরণ করেননি, যিনি ছাগল চরাননি। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনিও ছাগল চরিয়েছেন?’ নবি করীম (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি কয়েক কিরাত মজুরির বিনিময়ে মক্কাবাসীর বকরি চরাতাম।’” (বুখারী : ২২৬২)
শ্রমের পরিচয়
‘শ্রম’ শব্দের অর্থ মেহনত, শারীরিক পরিশ্রম, খধনড়ঁৎ, العمل ইত্যাদি। শ্রমিকের আরবি প্রতিশব্দ العامل এবং ইংরেজিতে বলা হয় ডড়ৎশবৎ। অর্থনীতির পরিভাষায়, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে উৎপাদনকার্যে নিয়োজিত মানুষের শারীরিক ও মানসিক সকল প্রকার কর্মপ্রচেষ্টাকে ‘শ্রম’ বলে। ইসলামী অর্থনীতির ভাষায়, মানবতার কল্যাণ, নৈতিক উন্নয়ন, সৃষ্টির সেবা ও উৎপাদনে নিয়োজিত সকল কায়িক ও মানসিক শক্তিকে ‘শ্রম’ বলে।
শ্রমের প্রকারভেদ
শ্রমকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায় :
ক. শারীরিক শ্রম : শারীরিক শ্রম হলো পুঁজিবিহীন জীবিকা অর্জনের জন্য দৈহিক পরিশ্রম। যেমনÑরিকশাচালক ও দিনমজুরের পরিশ্রম।
খ. শৈল্পিক শ্রম: শৈল্পিক শ্রম বলতে বোঝায়, যে কাজে শিল্প ও কৌশলবিদ্যাকে অধিক পরিমাণে প্রয়োগ করা হয়। যেমনÑঅঙ্কন, হস্তশিল্প, স্থাপনা নির্মাণ ইত্যাদি।
গ. বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম : বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম বলতে ওই সকল পুঁজিহীন শ্রমকে বোঝায়, যেখানে দেহের চেয়ে মস্তিষ্ককে বেশি কাজে লাগানো হয়। যেমনÑশিক্ষকতা, চিকিৎসা, আইন পেশা ইত্যাদি।
একটি প্রসিদ্ধ হাদিস সম্পর্কে আমরা সকলে জানি যে, একদা এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে ভিক্ষার জন্য হাত পাতেন। কিন্তু ভিক্ষুককে শক্তসমর্থ দেখে রাসুল (সা.) তাকে ভিক্ষাদানের পরিবর্তে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। রাসুল (সা.) ভিক্ষুকের মালিকানাধীন কম্বল বিক্রি করে একটি কুঠার কেনেন এবং নিজ হাতে তাতে হাতল লাগিয়ে দেন। ওই ব্যক্তিকে রাসুল (সা.) নির্দেশ দেন কুঠার নিয়ে গতর খাটিয়ে কাঠ কেটে জীবিকা নির্বাহ করার জন্য। তিনি তাকে ভিক্ষা পরিহার করতে বললেন। এ হাদিস থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হলো, ইসলাম সবসময় কাজ করার পক্ষে, শ্রম বিনিয়োগের পক্ষেÑনারী হোক বা পুরুষ হোক; ইসলামে অলসতার কোনো সুযোগ নেই।
ইসলামী শ্রমনীতির মূলনীতি
ইসলাম ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সকল বিষয়ের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মীমাংসার ক্ষেত্রে শাশ্বত মূলনীতি প্রদান করেছে। শ্রমিক-মালিকের দায়িত্ব কর্তব্য, অধিকার ও পাওনা সম্পর্কে দ্বন্দ্বের নিরসনের ক্ষেত্রেও এমন নীতি অনুসরণ করতে পারলে সুফল পাওয়া সম্ভব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমাদের মধ্যে যদি কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ মোতাবেক মীমাংসা করে নাও।” (সুরা নিসা : ৫৯)
ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা
আদর্শ সমাজ গঠনে সমাজে বসবাসরত সকল শ্রেণির পেশাজীবীদের কাজের মর্যাদা দান করা আবশ্যক। শ্রমিকেরা হলো উন্নয়ন ও উৎপাদনের চাবিকাঠি। যে জাতি যত বেশি পরিশ্রমী, সে জাতি তত বেশি উন্নত। শ্রমশক্তি মানবজাতির জন্য আল্লাহপ্রদত্ত এক অমূল্য সম্পদ। আল কুরআনে বর্ণিত আছে, “নিশ্চয় আমি মানুষকে শ্রমনির্ভর করে সৃষ্টি করেছি।” (সুরা বালাদ : ৪)
যেকোনো পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে শ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি শ্রম প্রদান করে। কর্মের এই গুরুত্বের কারণেই ইসলাম শ্রমিকদের সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে থাকে। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের কাজের গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম। আল্লাহ তায়ালা কাজের জন্য মানুষকে নামাজের পরে বেরিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি বলেন, “অতঃপর নামাজ শেষ করে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ করো এবং বেশি পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ করো, যাতে সফলকাম হতে পারো।” (সুরা জুমুআ : ১০)
রাসুল (সা.) শ্রমিকের মর্যাদা বর্ণনা করে বলেন, “কোনো ব্যক্তি তা থেকে উত্তম আহার করেনি, যা সে নিজ হাতে উপার্জন করে খেয়েছে। আল্লাহর নবি দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।” (বুখারী : ২০৭২)
নবি করীম (সা.) আরও বলেন,“মানুষের নিজ হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম উপার্জন আর নেই। সে যা কিছু নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য ও ঘরের ভৃত্যদের জন্য খরচ করে, তা সবই সদাকা।” (ইবনে মাজাহ : ২১৩৮)
ইসলাম মানুষের অধীনস্থ সৎ ও আমানতদার কর্মচারীর মর্যাদা ঘোষণা করেছে। তার কাজের দ্বিগুণ পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা হয়েছে, “যে গোলাম তার মনিবের কল্যাণ চায় এবং উত্তমরূপে তার রবের ইবাদতও করে, তার জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে।” (বুখারী : ২৫৪৬; মুসলিম : ৪৪০৮)
নবি করীম (সা.) শ্রমিকদের মর্যাদা সমুন্নত করে বলেন, “শ্রমিক হলো আল্লাহর বন্ধু।”
ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তির পরিবর্তে শ্রমকে উৎসাহিত করেছে। শ্রমিকদের মর্যাদা বর্ণনা করেছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, “ওই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন! তোমাদের কারও পক্ষে একগাছা রশি নিয়ে বের হওয়া এবং কাঠ সংগ্রহ করে পিঠে বোঝাই করে বয়ে আনার মর্যাদা ভিক্ষা চাওয়ার চেয়ে উত্তম। অথচ ভিক্ষার ক্ষেত্রে কেউ তাকে দান করতে পারে অথবা তাকে বিমুখও করতে পারে।” (বুখারী : ১৪৭০)
ইসলামে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক
ইসলামে মালিক-শ্রমিকের সম্পর্কের ভিত্তি ভ্রাতৃত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। শ্রমিকদের সাথে সদ্ব্যবহার, তাদের বেতন-ভাতা ও মৌলিক চাহিদা পূরণ ইত্যাদি বিষয়ে নবি করীম (সা.)-এর বাণীসমূহ দ্বারা পরিপূর্ণ ও মানবিক শ্রমনীতির পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যায়। মালিকদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, তিনি শ্রমিকের শ্রম টাকার বিনিময়ে গ্রহণ করেছেন, কিন্তু শ্রমিককে কিনে নেননি যে, শ্রমিক থেকে ইচ্ছামতো শ্রম নেবেন। এজন্য সকল প্রকার অন্যায়-অবিচার থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ইসলাম মালিক-শ্রমিক সম্পর্কে পরস্পরের প্রতি কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য অর্পণ করেছে। তারা সকলেই আল্লাহর বান্দা ও পরস্পর ভাই ভাই। রাসুল (সা.) বলেন, “তারা (তোমাদের অধীন কর্মচারী ও শ্রমিকরা) তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা কারও (দ্বীনী) ভাইকে তার অধীনস্থ করে দিলে সে যা খাবে, তাকে তা থেকে খাওয়াবে এবং সে যা পরিধান করবে, তাকে তা থেকে পরিধান করতে দেবে। আর যে কাজ তার জন্য কষ্টকর ও সাধ্যাতীত, তা করার জন্য তাকে বাধ্য করবে না। আর সে কাজ যদি তার দ্বারাই সম্পন্ন করতে হয়, তবে সে তাকে অবশ্যই সাহায্য করবে।” (বুখারী : ৬০৫০)
শ্রমিকের প্রতিও আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়ে বলেন, “সর্বোত্তম শ্রমিক সে, যে দৈহিক দিক দিয়ে শক্তসমর্থ ও আমানতদার।” (সুরা কাসাস : ২৬) আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, “কোনো বিষয়ে কখনও এ কথা বলবে না যে, এই কাজটা আমি আগামীকাল করব (এ কথা বলে আজকের করণীয় কাজকে ফেলে রাখবে না)।” (সুরা কাহাফ : ২৩) শ্রমিক তার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মালিককে তার কাজ বুঝিয়ে দেবে; ওয়াদার বরখেলাপ করবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ওয়াদা পূর্ণ করো, ওয়াদা সম্পর্কে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।” (সুরা ইসরা : ৩৪)
আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, “অধীনস্থদের সাথে দুর্ব্যবহারকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (তিরমিযী : ১৯৪৬) রাসুল (সা.) মালিকদের নির্দেশ দিয়েছেন, “তাদের সাথে তোমরা সন্তানসুলভ (দয়ার্দ্র) আচরণ করো এবং তোমরা যা খাও, তাদেরকে সে মানের খাবার দাও।” (ইবনে মাজাহ : ৩৬৯১)
মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্মচারীদের কর্তব্য হলো শ্রমিকদের সাথে মিলেমিশে থাকা, কথাবার্তা, ওঠা-বসার ক্ষেত্রে ইসলামী ভ্রাতৃসুলভ ব্যবহার ও আচার-আচরণ অবলম্বন করা, রোগ-শোক, মৃত্যু, ঘটনা-দুর্ঘটনায় নিজেরা উপস্থিত থেকে সহমর্মিতা প্রদর্শন করা।
মালিকের দায়িত্ব পালনে শ্রমিকের কর্তব্য
১. যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করা : মালিকের প্রতি একজন শ্রমিকের দায়িত্ব হলো, তিনি যে কাজের জন্য তাকে নিয়োগ দিয়েছেন, সে দায়িত্ব যথাযথভাবে সাধ্যমতো পালন করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কর্মচারী তার মালিকের সম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল। তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল আর তোমাদের প্রত্যেককে সে দায়িত্বের ব্যাপারে জবাব দিতে হবে।” (বুখারী : ৭১৩৮; মুসলিম : ১৮২৯)
২. যথাসম্ভব দক্ষতা ও যত্মশীলতার সাথে পেশাগত দায়িত্ব পালন করা : রাসুল (সা.) বলেন, “অবশ্যই আল্লাহ পছন্দ করেন যে, তোমাদের কেউ কোনো কাজ করলে সে যেন তা নৈপুণ্যের সাথে করে।” (বায়হাকী : ৫৩১৩)
৩. আমানতদারির সাথে পেশাগত দায়িত্ব পালন করা ও খেয়ানত না করা : নবি করীম (সা.) ইরশাদ করেন, “মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি। যথা : যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে। যখন সে ওয়াদা করে, ভঙ্গ করে। আর যখন তার কাছে কোনো জিনিস আমানত রাখা হয়, তখন সে তা খেয়ানত করে।” (তিরমিযী : ২৬৩১)
৪. মালিকের সম্পদ চুরি না করা : নবি করীম (সা.) বলেন, “যাকে আমরা কোনো দায়িত্ব প্রদান করেছি বা কর্মচারী নিয়োগ করেছি আর তাকে যথাযথ পারিশ্রমিক দিয়েছি, তখন সে তার প্রাপ্য অধিকারের বাইরে যা গ্রহণ করবে, তা হবে চুরি পর্যায়ের।” (আবু দাউদ : ২৯৩৩)
৫. মালিকের সাথে কোনোরূপ প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ না করা : নবি করীম (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (মুসলিম : ১০১)
শ্রমিকের অধিকারসমূহ
১. শ্রমের যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা : নবি করীম (সা.) বলেন, “যদি কোনো শ্রমিককে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ দিতে চাও, তবে প্রথমেই তাকে পারিশ্রমিক সম্পর্কে অবহিত করবে।” (নাসায়ী : ৩৮৫৯)। চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যেক শ্রমিককে যথাসময়ে তার পূর্ণ মজুরি পরিশোধ করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, “শ্রমিকের পারিশ্রমিক তার ঘাম শুকানোর পূর্বে দিয়ে দাও।” (ইবনে মাজাহ : ২৪৪৩)
নবি করীম (সা.) আরও বলেন, “তিন ধরনের ব্যক্তি আছে, কিয়ামতের দিন আমি যাদের দুশমন হব। আর আমি যাদের দুশমন হব, তাদের আমি লাঞ্ছিত ও পর্যুদস্ত করে ছাড়ব। উক্ত তিনজনের মধ্যে একজন হলো সে ব্যক্তি, যে কোনো শ্রমিককে কাজে লাগিয়ে নিজের পুরোপুরি কাজ আদায় করে নেয়, কিন্তু তার ন্যায্য মজুরি প্রদান করে না।” (বুখারী : ২২২৭)
২. কাজের সময় নির্ধারণ করা : শ্রমিকের নিকট হতে ততক্ষণ কাজ করে নেওয়া যাবে, যতক্ষণ সে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে। তার কাছ থেকে এর চেয়ে অতিরিক্ত শ্রম নেওয়া যাবে না। আর কর্মঘণ্টা সম্পর্কে নিয়োগের পূর্বেই কথা বলে নেওয়া উচিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “কাউকে আল্লাহ তার সাধ্যের অতীত কাজের দায়িত্ব দেন না।” (সুরা বাকারা : ২৮৬)
৩. কাজ আদায় করে নেওয়ার আগে শ্রমিককে তার কাজের ধরন সম্পর্কে অবগত করা।
৪. শ্রমিকের পেশা পরিবর্তন বা কর্মস্থল পরিবর্তনের অধিকার প্রদান করা।
৫. লভ্যাংশের ভিত্তিতে অংশীদারত্ব লাভ করা : ইসলাম শ্রমিকের দ্বারা উৎপাদিত পণ্যে তথা মুনাফায় অংশীদারত্ব প্রদানের কথা বলে। কেননা, পুঁজি ও শ্রমের সমন্বয়ের ফলেই উৎপাদন হয়। রাসুল (সা.) বলেন, “শ্রমিককে তার শ্রমের মাধ্যমে উৎপন্ন দ্রব্য থেকেও অংশ প্রদান করো। কারণ, আল্লাহর শ্রমিককে কিছুতেই বঞ্চিত করা যায় না।” (আহমাদ : ৮৬০৪)
৬. অন্যান্য মানুষের মতো শ্রমিকের মৌলিক অধিকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বস্ত্র ও বাসস্থান নিশ্চিত করা। নবি করীম সা.বলেন, “যে আমাদের মধ্যে কাউকে কাজে নিযুক্ত করল, অথচ তার কোনো ঘর বা স্থান নেই, তাকে যেন সে আবাসিক ঘর বানিয়ে দেয়।” (আহমাদ : ১৮০১৫)
৭. দক্ষ শ্রমিক হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে শ্রমিকদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৮. ক্ষতিপূরণের নামে শ্রমিকের ওপর জুলুম না করা।
৯. শ্রমিকের চাকুরির নিরাপত্তাবিধান করা।
১০. বার্ধক্য ও অসুস্থকালীন ভাতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করা।
১১. সাধ্যের বাইরে কাজ না দেওয়া।
১২. কর্মক্ষমতা কমে গেলেও শ্রমিককে কর্মস্থল থেকে বহিষ্কার না করা, যেন সে খেয়েপরে চলতে পারে।
১৩. যথাযথ সম্মান প্রদান করা।
১৪. ধর্মকর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করা।
১৫. প্রতিকার চাওয়ার অধিকার দেওয়া।
১৬. অতিরিক্ত সময়ের জন্য অতিরিক্ত ন্যায্য মজুরি প্রদান করা।
১৭. প্রাতিষ্ঠানিক কর্মচারী বা শ্রমিককে ব্যক্তিগত কাজে না খাটানো। যদি একান্তই কোনো কাজ করাতে হয়, তার জন্য ব্যক্তিগতভাবে মজুরি প্রদান করা।
১৮. শ্রমিকের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া।
১৯. মাঝে মাঝে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে শ্রমিকদের পারিবারিক মিলনমেলার আয়োজন করা।
২০. শ্রমিকদের সন্তানসন্ততির পড়ালেখার শিক্ষা উপকরণ প্রদান করা।
২১. কর্মস্থলে শ্রমিকদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে আহারের ব্যবস্থা করা।
২২. যেকোনো দুর্যোগে শ্রমিকদের পাশে থাকা।
লেখক :মুহাম্মদ আসাদ উল্লাহ আদিল
অধ্যক্ষ, ন্যাশনাল ইংলিশ স্কুল চিটাগাং



