আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাঙালির আবেগের বরপুত্র, বাংলা কবিতায় দ্রোহের চিরন্তন প্রতীক এবং সুরের ভুবনে ‘গানের বুলবুল’ খ্যাত আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী আজ। বাংলা ক্যালেন্ডারের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠের ১১ তারিখে এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের সৃষ্টিশীল জীবনকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করে পুরো জাতি। নজরুল কেবল একজন কবিই ছিলেন না; তাঁর ক্ষুরধার লেখনী, কণ্ঠশিল্পী, অভিনেতা ও সম্পাদকের পরিচয়ের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল এক অভিমানী গভীর সংবেদনশীল হৃদয়, যা আজীবন অনুভব করেছে শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের অবর্ণনীয় আর্তি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর রচিত প্রতিটি পঙ্ক্তি আজও কোটি তরুণের ধমনিতে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেয়। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, সঙ্গীত আর নিজস্ব দর্শনের যুগান্তকারী মেলবন্ধনে নজরুল সমৃদ্ধ ও বর্ণাঢ্য করেছেন সমগ্র বাংলা সাহিত্যকে।
সংগ্রামমুখর শৈশব ও বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা:
সৃষ্টিশীলতার এক জাদুকরী ও অনন্য প্রতিভার নাম কাজী নজরুল ইসলাম। শিল্পকলার প্রায় প্রতিটি শাখাতেই ছিল তাঁর অবাধ ও স্বচ্ছন্দ বিচরণ। ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে এক অতি দরিদ্র পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব, কৈশোর কিংবা তারুণ্য—জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে তাঁকে চরম প্রতিকূলতা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছে। আসানসোলের এক রুটির দোকানে কাজ করা সেই ছোট্ট ‘দুখু মিয়া’ জীবনসংগ্রামের নানা বাঁকে জড়িয়েছিলেন বহু পেশায়। পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধক্ষেত্রের সেই বাস্তব জীবনবোধ তাঁর পরবর্তী সাহিত্যকর্মে এক বিশাল ক্যানভাস তৈরি করে দিয়েছিল।
ধূমকেতুর উত্থান ও ব্রিটিশের রাজকারাগার:
যুদ্ধ থেকে ফিরে তৎকালীন প্রভাবশালী কবি ও বিদগ্ধ সাহিত্যিকদের সংস্পর্শে আসেন নজরুল। ১৯২২ সালে তিনি প্রকাশ করেন ঐতিহাসিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা। আপসহীন ও নির্ভীক সাংবাদিকতার কারণে শুরু থেকেই তিনি ব্রিটিশ শাসকদের চক্ষুশূলে পরিণত হন। এরপর তাঁর বিখ্যাত “আনন্দময়ীর আগমনে” কবিতার রাজদ্রোহী সুরের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে। কিন্তু কোনো কারাগারের প্রাচীরই তাঁর ভেতরের দ্রোহকে আটকে রাখতে পারেনি। মাত্র ২২ বছরের এক সংক্ষিপ্ত সক্রিয় লেখক জীবনে তিনি রচনা করেছেন প্রায় তিন হাজার গান, লিখেছেন অসংখ্য কালজয়ী কবিতা, ছোটগল্প ও সমাজ পরিবর্তনকারী উপন্যাস।
চলচ্চিত্র ও সুরের মায়াজাল:
কাজী নজরুল ইসলাম শুধু কাব্য জগতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। সাহিত্যের সমান্তরালে তিনি তৎকালীন চলচ্চিত্র অঙ্গনেও রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। তিনি নিজের পরিচালিত এবং সুরারোপিত ছায়াছবি “ধ্রুব”-তে এক অনন্য চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন। সম্পাদনার টেবিল থেকে চলচ্চিত্রের রূপালী পর্দা কিংবা সুরের মায়াজাল—সবখানেই তিনি ছিলেন সমান দেদীপ্যমান। সেই আসানসোলের রুটি বানানোর সাধারণ ছেলেটি আজ বাংলা সংস্কৃতির এক বিশাল ও চিরন্তন প্রতিষ্ঠান। যিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে না থেকেও প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ বাঙালির মননে উপস্থিত আছেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন ও শেষ বিদায়:
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের পর, ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে কবি নজরুলকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় এবং তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় পাখির মর্যাদার মতো ‘জাতীয় কবি’র সম্মানে ভূষিত করা হয়। এরপর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই দেশের আলো-বাতাসেই অতিবাহিত করেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বিএসএমএমইউ) এই মহান সাধক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির নিজের রচিত গানের আকুল ইচ্ছানুসারেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।