রামিসা হত্যা মামলা: আদালতে সোহেল রানার দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা

জুন ৩, ২০২৬ | Feature-2 |

আদালত প্রতিবেদক: রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসা আক্তারকে (৮) ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা মামলার আত্মপক্ষ সমর্থনে ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন অন্যতম আসামি স্বপ্না আক্তার। তবে বিচারকের ধারালো প্রশ্নের মুখে পড়ে নিজেকে সামলাতে না পেরে প্রধান আসামি মো. সোহেল রানা বিচারকের উদ্দেশ্যে আকুতি জানিয়ে বলেছেন, “স্যার, আমাকে মাফ করে দেন। আমি নির্দোষ, খালাস চাই।” একই সাথে অপর এক রহস্যময় ব্যক্তির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “আমার সাথে ডলার ছিল। সেটা কেউ দেখে নাই। তাকে ধরেন স্যার, সেও তো দোষী।”

আজ বুধবার (৩ জুন) ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামিদের বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও ১৬ জনের দেওয়া সাক্ষ্য পড়ে শোনানোর পর এই নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আদালত আগামীকালের (বৃহস্পতিবার) মধ্যে এই মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন নির্ধারণ করেছেন।

আদালতে যেভাবে চলল জেরা:

আদালত সূত্রে জানা গেছে, আজ সকালে কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তায় দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর সকাল ১১টা ১০ মিনিটে বিচারক এজলাসে ওঠেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় বিচারক তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং মামলার ১৬ জন সাক্ষীর দেওয়া জবানবন্দি পড়ে শোনান।

এ সময় বিচারক তাদের সরাসরি প্রশ্ন করেন— ‘আপনারা দোষী না নির্দোষ?’ উত্তরে স্বপ্না আক্তার নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বলেন, “আমি কিছু করি নাই, আমি নির্দোষ।” অন্যদিকে, প্রধান আসামি সোহেল রানা প্রথমে ক্ষমা চেয়ে খালাস চাইলেও পরক্ষণেই টাকার (ডলার) লেনদেন সংক্রান্ত অন্য একজনের সম্পৃক্ততার দাবি তুলে বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।

মাত্র ২ দিনে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ, দ্রুততম বিচারের রেকর্ড:

এর আগে গত ১ জুন পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যা মামলায় বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লাসহ ১৭ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির হতে সমন জারি করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। পরদিনই অর্থাৎ ২ জুন মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ১৬ জনের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করে সাক্ষ্য পর্ব সমাপ্ত ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম সময়ের একটি।

এর আগে গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান এই দম্পতিকে অভিযুক্ত করে আদালতে দ্রুত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেন। একই দিন ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করেন।

ফ্ল্যাটের বালতিতে ছিল মাথা, যে নৃশংসতা ঘটেছিল সেই সকালে:

মামলার এজাহার ও অভিযোগ সূত্র অনুযায়ী, নিহত শিশু রামিসা আক্তার পল্লবীর পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে ফুঁসলিয়ে তাদের ফ্ল্যাটের রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য তার মা-বাবা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পান তারা।

তখন ডাকাডাকির পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন মিলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। ঘরের ভেতরে ঢুকেই তারা শিউরে ওঠেন। আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসা আক্তারের মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ এবং কাটা মাথাটি রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে রাখা দেখতে পান।

সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ঘরের ভেতর থেকে আসামি স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হয়। তখন জনরোষের মুখে স্বপ্না স্বীকার করেন যে, তার স্বামী লম্পট মো. সোহেল রানা (৩০) হীন কামলালসা চরিতার্থ করার জন্য রামিসাকে বাথরুমের ভেতরে আটকে রেখে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে এবং পরে প্রমাণ লোপাটের জন্য নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে গেছে।

এই লোমহর্ষক ঘটনায় ১৯ মে রাতেই শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ প্রথমে স্বপ্নাকে গ্রেপ্তার করে এবং পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন ২০ মে প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতে নিজের পৈশাচিক অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিলেন।



Leave a Comment