শিশু রামিসা হত্যায় স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড: রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত কার্যকরের দাবি
আদালত প্রতিবেদক: রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী শিশু রামিসা আক্তারকে (৮) ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার মামলায় ঘাতক সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষ ও ভুক্তভোগী পরিবার। চাঞ্চল্যকর এই মামলায় মাত্র ১৯ দিনে বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক অনন্য ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো।
আজ রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় আসামিদের সর্বোচ্চ এই শাস্তি প্রদান করেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবার মোনাজাত, আইনজীবীদের সন্তোষ:
আদালত কক্ষেই রায় শোনার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত শিশু রামিসার বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাত তুলে মোনাজাত করে তিনি এই রায়ে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ফাঁসির আদেশ দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান।
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “এই রায়ের মাধ্যমে সমাজ একটি বড় বার্তা পেল।” অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহও রায়ের যৌক্তিকতা স্বীকার করে বলেন, “আসামি সোহেল রানা নিজেই দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। রায়ে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা হওয়ায় প্রকৃত অর্থেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
অপরাধে সহযোগিতা ও নীরবতায় স্ত্রীরও ফাঁসি:
রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালের বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, প্রধান আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সরাসরি সহযোগিতার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বিচারক উল্লেখ করেন, এমন একটি লোমহর্ষক অপরাধ সংঘটনে স্বপ্না শুধু সহযোগিতাই করেননি, বরং তা প্রতিরোধে বা শিশুটিকে বাঁচাতে কোনো ধরনের ভূমিকাই নেননি।
মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আদালত মূল আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন, যা আইনগত উত্তরাধিকারী হিসেবে ভিকটিম রামিসার পরিবার পাবে। আসামিরা ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে এই টাকা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কঠোর নিরাপত্তায় যেভাবে সম্পন্ন হলো রায়:
এর আগে আজ সকাল ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে কারাগার থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে স্বামী-স্ত্রীকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় নিয়ে আসা হয়। বেলা ১০টা ৪৬ মিনিটে তাদের ট্রাইব্যুনালের এজলাসে তোলা হয়। ঠিক বেলা ১১টায় বিচারক মাসরুর সালেকীন এজলাসে এসে রায় পড়া শুরু করেন এবং বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। গত বৃহস্পতিবার (৫ জুন) রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেছিলেন।
ঘটনার নির্মম পটভূমি:
মামলার বিবরণ ও আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগী রামিসা আক্তার স্থানীয় পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তাদের ফ্ল্যাটের ভেতর ডেকে নেয়। ফ্ল্যাটের অন্য সদস্যরা কাজে চলে যাওয়ার পর মাদকাসক্ত অবস্থায় সোহেল রানা শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে মুখে কাপড় গুঁজে ধর্ষণ করে। রামিসা জ্ঞান হারিয়ে ফেললে সে মারা গেছে ভেবে অপরাধের আলামত নষ্ট করতে একটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মরদেহ টুকরো করে বিকৃত করে।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তাকে খুঁজতে বের হয়ে আসামির ফ্ল্যাটের সামনে রামিসার জুতো দেখতে পান। আশপাশের লোকজন যখন দরজায় অনবরত ধাক্কা দিচ্ছিলেন, তখন পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সোহেলকে জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতে বলে তার স্ত্রী স্বপ্না। বাইরে জনতা দরজায় ধাক্কা দেওয়ার সময় স্বপ্না ভেতর থেকে শক্ত করে দরজা আটকে রাখে, যাতে তার স্বামী একটি রেঞ্চ দিয়ে জানালার গ্রিল ভেঙে সহজে পালিয়ে যেতে পারে। সোহেল পালিয়ে যাওয়ার পরই স্বপ্না দরজা খোলে।
পরবর্তীতে প্রতিবেশীরা ঘরের ভেতর প্রবেশ করে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং একটি বালতির ভেতর তার কাটা মাথা দেখতে পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল দেয়। পুলিশ এসে স্বপ্নাকে আটক করে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থেকে মূল ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন ২০ মে নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা তদন্ত শেষে মাত্র ৫ দিনের মাথায় গত ২৪ মে ১৭ জন সাক্ষীর নাম উল্লেখ করে সোহেল ও স্বপ্নার বিরুদ্ধে আদালতে দ্রুত চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর টানা শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে আজ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করা হলো।