ইউএনএইচসিআর এক্সকম ব্যুরোর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলো বাংলাদেশ

জুন ১৭, ২০২৬ | Feature-2 |

কূটনৈতিক প্রতিবেদক: দেশের বহুপক্ষীয় কূটনীতির ইতিহাসে এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক স্পর্শ করলো বাংলাদেশ। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) নীতি-নির্ধারণী ফোরাম তথা নির্বাহী কমিটির (এক্সকম) ব্যুরোর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব লাভ করেছে বাংলাদেশ। ১৯৫৯ সালে ইউএনএইচসিআর-এর নির্বাহী কমিটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর বিগত ৬৭ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম বাংলাদেশ এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যুরোতে শীর্ষ পদের দায়িত্ব গ্রহণ করলো।

আজ বুধবার (১৭ জুন) জেনেভা থেকে ঢাকায় পাওয়া এক আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বার্তায় এই ঐতিহাসিক অর্জনের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহানের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ:

বার্তায় জানানো হয়, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয় ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে চার সদস্যবিশিষ্ট শক্তিশালী এক্সকম ব্যুরোর চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর আসন অলঙ্কৃত করেছেন। এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সর্বসম্মত একক প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ এই পদের জন্য মনোনীত হয়। পরবর্তীতে ভিন্ন দুটি আঞ্চলিক গ্রুপের প্রতিনিধিত্বকারী রাষ্ট্র আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের এই মনোনয়নে জোরালো সমর্থন জানায়। শেষ ধাপে নির্বাহী কমিটির অন্তর্ভুক্ত বিশ্বের ১১০টি সদস্যরাষ্ট্রের সকলে সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহানের মনোনয়ন চূড়ান্ত অনুমোদন করে।

বাংলাদেশের এই কূটনৈতিক অর্জনের আদ্যোপান্ত:
৬৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম: ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ কখনও ইউএনএইচসিআর-এর নির্বাহী কমিটির ব্যুরোতে দায়িত্ব পালন করেনি।

বিশ্ব সম্প্রদায়ের আস্থা: এই ঐতিহাসিক নির্বাচন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর আস্থা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় দেশের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।

সংকটময় মুহূর্তে দায়িত্ব: বিশ্বজুড়ে রেকর্ড সংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতি, ক্রমবর্ধমান মানবিক চাহিদা এবং চরম আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের মতো বৈশ্বিক শরণার্থী সুরক্ষা ব্যবস্থার এক অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ এই অভিভাবকের দায়িত্ব গ্রহণ করল।

রোহিঙ্গা সংকটের মাঝে এই দায়িত্বের বিশেষ তাৎপর্য:

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে টেকসই আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সোচ্চার বাংলাদেশের জন্য এই দায়িত্ব গ্রহণ অত্যন্ত বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। মানবিক সহায়তা ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ইস্যুতে একে বাংলাদেশের গঠনমূলক নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রতি সুদৃঢ় অঙ্গীকারের এক বৈশ্বিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই শীর্ষ পদের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে।

নেতৃত্বে পেশাদার কূটনীতিক নাহিদা সোবহান:

ইউএনএইচসিআর-এর এক্সকম ব্যুরোর নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাদার কূটনীতিক। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি এর আগে রোম, কলকাতা ও জেনেভায় বাংলাদেশ মিশনে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি জর্ডানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং কানাডায় হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাওয়ার আগে তিনি ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘জাতিসংঘ অনুবিভাগ’-এর মহাপরিচালক (DG) হিসেবেও সাফল্যের সাথে কাজ করেছেন। বিশেষ করে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকে তিনি ইউএনএইচসিআরসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।



Leave a Comment