মাথা উঁচু করেই দ্রুত বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব: শেখ হাসিনা

May 19, 2026 | Feature-2 |

বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তন এবং বিএনপি সরকার গঠনের পর এই প্রথম নিজের এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন, “আমাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। সৃষ্টিকর্তা যেহেতু বাঁচিয়ে রেখেছেন, আমি দ্রুতই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব। মাথা উঁচু করে, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরানোর গর্ব নিয়েই ফিরব।”

সম্প্রতি বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফরে গিয়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে প্রত্যর্পণের (ফেরত পাঠানোর) আনুষ্ঠানিক আর্জি জানানোর পর এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ্যে এলো। আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের প্রতিবেদনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, হাসিনাকে এই মুহূর্তে ফেরত পাঠানো বা প্রত্যর্পণ করা নিয়ে মোদী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে (PMO) কোনো চিন্তাভাবনা নেই।

১৯৮১ সালের ১৭ মে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঠিক ৪৫ বছর পর ভারতে বসে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারের মূল অংশগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা ও প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে:
দলের ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা বা প্রতিকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে রাজনীতিতে ফিরবেন— এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা ইতিহাসের উদাহরণ টেনে আনন্দবাজার-কে বলেন, “বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যা করার পরেও তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার সব চেষ্টা করেছিল। কিন্তু উল্টো আওয়ামী লীগ আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। যারা এই নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী মনে করছেন, তাদের ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতে বলব।”

তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে বলেন, “আমাদের কোটি কোটি সমর্থক এবং লাখো নেতা-কর্মী দেশেই রয়েছেন। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী সময়ে সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের নেতা-কর্মীরা সরব। আওয়ামী লীগ মানুষের আবেগে রয়েছে। ফলে আমাদের ফিরে আসা অনিবার্য, শুধু কিছু সময়ের ব্যাপার। আরও সংগঠিত হয়ে, শক্তিশালী হয়ে ফিরব। নীরবে তার প্রস্তুতি চলছে।”

নেতা-কর্মীদের দেশত্যাগ ও দলীয় মূল্যায়ন:
কলকাতা ও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও নেতা-কর্মীদের অবস্থান প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “কেউ স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করেননি। ভয়াবহ পরিস্থিতিতে প্রাণে বাঁচতে অনেকেই দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। ছয়শর বেশি নেতা-কর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং দেড় লাখের বেশি নেতা-কর্মীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই অবস্থায় যাঁরা বাইরে রয়েছেন, তাঁরা বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনে বাংলাদেশের প্রকৃত পরিস্থিতি ও অগণতান্ত্রিক রূপ তুলে ধরছেন। দেশে ন্যূনতম আইনের শাসন তৈরি হলেই তাঁরা ফিরবেন।”

‘ভারত-তোষণ’ বিতর্ক ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি:
বিরোধীদের দীর্ঘদিনের ‘ভারত-তোষণ’ বা তাঁবেদারির অভিযোগকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে শেখ হাসিনা আনন্দবাজার-কে বলেন, “আওয়ামী লীগ নাকি ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছে— বিরোধীদের এমন মিথ্যাচার এখন প্রমাণিত। বর্তমান বিএনপি সরকার বা এর আগের অন্তর্বর্তী সরকার এখনও পর্যন্ত একটিও তথাকথিত ‘দেশবিরোধী চুক্তি’ জনগণের সামনে হাজির করতে পারেনি।”

নিজের শাসনামলের কূটনৈতিক ও সীমান্ত চুক্তিগুলোর সাফল্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “১৯৯৬ সালে আমরা গঙ্গার পানি চুক্তি করেছিলাম। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ভারতের থেকে প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা বাংলাদেশের মানচিত্রে যোগ করেছিলাম। ২০১৫ সালে স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হয়েছে। এমনকি বর্তমান জ্বালানি সংকটের সময়ে ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন’ বাংলাদেশের লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে। এর মধ্যে কোনটা অন্য দেশের তাঁবেদারি, তা বিএনপি বলুক।” তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সর্বদাই দেশের জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিদেশনীতি পরিচালনা করেছে।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা



Leave a Comment