মিয়ানমারে সীমান্তবর্তী গ্রামে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নারী-শিশুসহ নিহত অন্তত ৫৫

জুন ১, ২০২৬ | Feature-2 |

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মিয়ানমারের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত শান রাজ্যের চীন সীমান্তসংলগ্ন একটি গ্রামে খনির বিস্ফোরক মজুত কেন্দ্র থেকে ঘটা এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৫৫ জন নিহত হয়েছেন। এই শক্তিশালী বিস্ফোরণে আরও বহু মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন এবং পুরো একটি আবাসিক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গতকাল রবিবার (৩১ মে) স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে শান রাজ্যের নামখাম টাউনশিপের কাউং তাত গ্রামে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, নিহত ৫৫ জনের মধ্যে ২৫ জন নারী এবং ৩০ জন পুরুষ রয়েছেন। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে হতাহতের এই সংখ্যাটি কিছুটা ভিন্নভাবেও উল্লেখ করা হচ্ছে।

আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী, প্রথমে ভাবা হয়েছিল ‘বিমান হামলা’:

বিস্ফোরণের পরপরই কাউং তাত গ্রামের আকাশে বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। এলাকাটির নিয়ন্ত্রণকারী এবং মিয়ানমার সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াইরত জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘তাআং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি’ (টিএনএলএ) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, খনি ও পাথর উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক বিস্ফোরক পদার্থ থেকে দুর্ঘটনাবশত এই বিস্ফোরণটি ঘটেছে। তবে ঠিক কী কারণে এই বিস্ফোরণের সূত্রপাত, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি গোষ্ঠীটি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে পুরো এলাকায় মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, বিকট শব্দের কারণে প্রথমে অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে এটি সামরিক জান্তার কোনো বিমান হামলার ঘটনা। তিনি জানান, নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশুও রয়েছে এবং শত শত ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় পুরো একটি পাড়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

‘মনে হচ্ছিল পৃথিবীর শেষ দিন নেমে এসেছে’:

সামান্য আঘাত পেয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া ওই গ্রামের এক নারী বাসিন্দা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে লেখেন, “নিছক ভাগ্যই আজ আমার জীবন বাঁচিয়েছে। আমি শোবার ঘরে বসে নুডলস খেতে খেতে ফোন দেখছিলাম। যদি ওই সময় রান্নাঘরে থাকতাম, তাহলে আজ আর বেঁচে থাকতাম না।”

বিস্ফোরণে নিজের বাড়িটি হারিয়ে ফেলা এই নারী জানান, ঘটনার পর চারদিকে শুধু কান্না, আর্তনাদ আর স্বজনদের খোঁজার আকুতি শোনা যাচ্ছিল। তিনি বলেন, “মানুষ পাগলের মতো কাঁদছিল, বাবা-মাকে ডাকছিল। চোখের সামনে যা দেখছিলাম, তাতে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর শেষ দিন নেমে এসেছে।” আবাসিক এলাকার এত কাছাকাছি কীভাবে এমন বিপজ্জনক বিস্ফোরক মজুত কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, নিহতদের স্বজনরা এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত শান্ত হবেন না।

বিদ্রোহী অর্থায়ন ও খনি নিরাপত্তা:

ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া বিভিন্ন ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, বিস্ফোরণের স্থলে বিশাল একটি গর্ত তৈরি হয়েছে এবং আশপাশের ভবনগুলো ধূলিসাৎ হয়ে পোড়া ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে।

উল্লেখ্য, টিএনএলএ মিয়ানমারের অন্যতম শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা দেশটির সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের অনেক বিদ্রোহী গোষ্ঠী তাদের যুদ্ধ পরিচালনার বিশাল ব্যয় মেটাতে ও অর্থ সংগ্রহে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে এই খনি ও বিস্ফোরক কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় প্রায়শই খনি ধস, ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও আকস্মিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে থাকে।



Leave a Comment