মাথা ঝুঁকিয়ে স্পিকারকে সম্মানের নিয়ম ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক; সংসদে জামায়াত এমপির আপত্তির পর প্রথা বদল
সংসদ প্রতিবেদক: জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় কিংবা আসন গ্রহণ ও ত্যাগের কালে আর বাধ্যতামূলকাভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে স্পিকারের চেয়ার বা সভাপতির প্রতি সম্মান জানাতে হবে না। এ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা যার যার নিজস্ব ধর্মীয় রীতি ও বিশ্বাস মেনে সম্মান প্রদর্শন করতে পারবেন বলে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারের পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এই চূড়ান্ত রুলিং ও নির্দেশনা জারি করেন।
জামায়াত এমপি মুজিবুর রহমানের আপত্তির সুরাহা:
এর আগে গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান স্পিকারের প্রতি মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানানোর বিদ্যমান ঔপনিবেশিক প্রথাটির আইনি ও ধর্মীয় সুরাহার জন্য পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে স্পিকারের কাছে জোরালো অনুরোধ জানান।
তিনি পবিত্র ইসলামের আকিদাগত আপত্তি তুলে ধরে বলেছিলেন, “কাউকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য এভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করার এই প্রথা ও রীতি ইসলামের মূল বিশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি ‘সাংঘর্ষিক’ এবং তা ‘শিরকের (আল্লাহর সাথে অংশীদারিত্ব) কাছাকাছি চলে যায়’।” মুসলিম সংসদ সদস্যদের ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার্থে বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি জানান তিনি। তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছিলেন, সংসদের মূল কার্যপ্রণালি বিধি পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখে বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরে সংসদকে রুলিংয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৭ (১) নং ধারার ইতিহাস:
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ আজ সংসদে রুলিং দিতে গিয়ে কার্যপ্রণালি বিধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সংশোধনী ও আইনি ব্যাখ্যা সংসদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরেন:
মূল কার্যপ্রণালি বিধি ২৬৭: এই বিধি অনুযায়ী, সংসদের বৈঠক চলাকালে সংসদে প্রবেশ করার বা সংসদকক্ষ ত্যাগ করার সময় এবং আসন গ্রহণ বা ত্যাগ করার সময় প্রত্যেক সদস্যকে বাধ্যতামূলকভাবে সভাপতির (স্পিকারের) প্রতি ‘ঝুঁকিয়া’ সম্মান প্রদর্শন করার নিয়ম ছিল।
অষ্টম সংসদের ঐতিহাসিক সংশোধনী: স্পিকার তাঁর রুলিংয়ে জানান, “আমি পূর্বের নথি পরীক্ষা করে দেখেছি, দেশের অষ্টম জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি সংসদে একটি বিশেষ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছিল, যা পরে সংসদে বিবেচিত ও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সেই প্রতিবেদনের আলোকে ২৬৭ (১) বিধির সংশোধনী এনে ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হয়।”
ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিতের নির্দেশ:
সংসদীয় নথির আইনি ব্যাখ্যা শেষ করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে চূড়ান্ত রুলিং দিয়ে বলেন, “যেহেতু আমাদের সংসদের মূল কার্যপ্রণালি বিধি থেকে ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি অনেক আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেহেতু এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই। আজ থেকে আপনারা জাতীয় সংসদে প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় যার যার নিজস্ব ধর্মীয় রীতি, বিশ্বাস ও অনুশাসন অনুযায়ী স্পিকারের চেয়ার বা সভাপতির প্রতি সম্মান জানাবেন।” স্পিকারের এই ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতাসূচক রুলিংকে টেবিল চাপড়ে স্বাগত জানান অধিবেশনে উপস্থিত সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যবৃন্দ।