আগের সরকারের রেখে যাওয়া ৫০ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিলের বোঝা টানতে হচ্ছে: অর্থমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকার ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রচলিত প্রবণতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে চায় এবং এর বিকল্প অর্থায়ন নিয়ে নানামুখী চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সাথে তিনি স্বীকার করেছেন যে, পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কাজ করতে হওয়ায় এবারের বাজেটটি পুরোপুরি ‘পারফেক্ট’ বা নিখুঁত করা সম্ভব হয়নি।
আজ রোববার (২১ জুন) রাজধানীর গুলশানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট সংলাপে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও ঋণের বোঝা:
বর্তমান বাজেটকে শতভাগ পারফেক্ট না উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “সরকার বাজেটের নানা দিক এখনও গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে। এটা সত্য যে, এই বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ আছে। আমাদের কর ও জিডিপির (Tax-GDP Ratio) অনুপাত একেবারেই ভালো না। এর ওপর বর্তমানে পুরো বিশ্বজুড়েই বিদেশি ঋণের প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে। এমন একটি বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যেই আমাদের বাজেট ঘোষণা করতে হয়েছে।”
বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আগের সরকার শুধু ৫০ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিলই বকেয়া রেখে গেছে। তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে আমদানি ও লজিস্টিকস ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফলে মানুষের পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোকে আমরা সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখছি।”
সিপিডি সংলাপে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের ৪টি মূল অর্থনৈতিক বার্তা:
বিকল্প অর্থায়ন: ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে বাজেট ঘাটতি মেটাতে বিকল্প উৎস খোঁজার ঘোষণা।
এনবিআর সংস্কার: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পলিসি বিভাগ আর আমলাদের দিয়ে চলবে না; সেখানে কর বিশেষজ্ঞদের (Tax Experts) দায়িত্ব দেওয়া হবে।
বন্ড ও কর সুবিধা: যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পণ্য রপ্তানি করতে চাইলে বন্ড সুবিধা পাবেন, আর বন্ড সুবিধা না নিলে তাকে বিশেষ কর সুবিধা দেওয়া হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে লক্ষ্য: চলতি বাজেটে শিক্ষাখাতে মোট বরাদ্দের ২ শতাংশ দেওয়া হলেও লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশে উন্নীত করা। একইভাবে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্যখাতেও বরাদ্দ ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।
এনবিআর সংস্কার ও শিক্ষা-স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ:
রাজস্ব খাতের বড় সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের এনবিআরকে পুরোপুরি সচল ও আধুনিক করতে হবে। দেশের একটা বড় শ্রেণির মানুষের মধ্যে কর না দেওয়াটাকে ভালো কিছু ভাবার মানসিকতা তৈরি হয়েছে, এই মানসিকতা থাকলে দেশ এগোবে না। কর কাঠামো সহজ করতে এনবিআরের পলিসি বিভাগ কর বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরিচালনা করা হবে। রপ্তানি বাড়াতে ব্যবসায়ীদের বন্ড ও করের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট করে বলেন, “এ বছর মোট বাজেটের ২ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ করা হয়েছে। আমি বলব না এটি একদম কম, তবে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশ। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও বলেছি স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে আমরা ৫ শতাংশ বরাদ্দে যাব। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ছাড়া আমরা শুধু মঞ্চে বক্তৃতা দিতে পারব, কিন্তু উন্নত রাষ্ট্র গঠন বা কোনো বড় অর্জন সম্ভব হবে না। দক্ষ জনশক্তি গড়তে এই দুই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে।”