পবিত্র শহর কোমে খামেনির মরদেহ, রাজপথে লাখো মানুষের শোকযাত্রা

July 7, 2026 | Feature-2 |

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সদ্যপ্রয়াত ও নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তেহরান থেকে হেলিকপ্টারযোগে শিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম পবিত্র শহর কোমে এসে পৌঁছেছে। আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাজধানী তেহরানে টানা তৃতীয় দিনের মতো এই নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজপথে নেমে আসে লাখ লাখ মানুষের এক অভূতপূর্ব ও সুবিশাল জনস্রোত।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আজ সকালে তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত পবিত্র শহর কোমে সর্বোচ্চ নেতার কফিন এসে পৌঁছালে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কোমে বিশেষ শোকযাত্রা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর আগামী বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মাশহাদ শহরে নিজ জন্মভূমিতে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরানের এই ঐতিহাসিক শোকযাত্রায় মানুষের উপস্থিতি ১৯৮৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মহানায়ক আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার সমাবেশের পর দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বৃহত্তম ও তুলনাহীন।

এই ঐতিহাসিক শোকযাত্রায় একটি সুসজ্জিত ট্রাকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিনের পাশাপাশি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত তাঁর পরিবারের অপর চার সদস্যের মরদেহও বহন করা হয়। শোক সাগরে ভাসতে থাকা লাখো মানুষ কফিনের ওপর অবিরাম ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাঁদের প্রিয় নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। নিহতদের কফিনের মাঝে খামেনির মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনির একটি ছোট কফিনও ছিল, যা উপস্থিত সাধারণ মানুষের চোখ অশ্রুসজল করে তোলে।

শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া হামিদ নামে এক স্থানীয় নাগরিক আল জাজিরাকে জানান, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চেয়েছিল ইরানকে টুকরো টুকরো করে বিভক্ত করতে, কিন্তু তাদের সেই অশুভ বিভক্তি ঠেকিয়েছেন খামেনি; তাই তাঁর প্রতি চিরকৃতজ্ঞতা জানাতেই এই জনস্রোত। মারজিয়েহ নামে অপর এক শোকাহত নারী বলেন, তাঁরা তাঁদের শহীদ নেতাকে জানাতে এসেছেন যে তাঁর রক্ত কোনোভাবেই বৃথা যেতে দেওয়া হবে না এবং তাঁরা খামেনির ইসলামি আদর্শের প্রতি নিজেদের আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করছেন।

এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণকারী খামেনির উত্তরসূরি ও তাঁর সুযোগ্য সন্তান মোজতবা খামেনিকে এখনো পর্যন্ত জনসমক্ষে দেখা যায়নি, এমনকি তিনি পিতার এই জানাজাতেও সশরীরে উপস্থিত হননি। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট গবেষক মোহাম্মদ এসলামী এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, বর্তমানে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত নাজুক ও স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে, যার ফলে চরম নিরাপত্তাজনিত কারণে ও শত্রুপক্ষের আকস্মিক হামলার আশঙ্কায় মোজতবার এই মুহূর্তে জনসমক্ষে আসা সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর বরাতে জরুরি সেবা বিভাগের প্রধান জাফর মিয়াদফার জানিয়েছেন, তীব্র গরম ও প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে শোকানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ৩৪ হাজারের বেশি মানুষকে জরুরি চিকিৎসা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে, তবে স্বস্তির বিষয় হলো কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। এই ঐতিহাসিক বিদায় অনুষ্ঠানে ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদসহ দেশটির সামরিক ও বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহাম্মদ বাকের জোলঘাদর হুঙ্কার দিয়ে বলেন, লাখো মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ইরানি জাতির পক্ষ থেকে তাদের প্রধান শত্রু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্দেশে একটি স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা।



Leave a Comment