প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের ভিডিও ‘এআই নির্মিত নয়’: দ্য ডিসেন্ট
নিউজ ডেস্ক: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য ফরহাদ হোসেন আজাদের সঙ্গে এক নারীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভাইরাল ভিডিও এবং ছবি ‘ভুয়া ও এআই-নির্মিত’ বলে দেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করলেও অনুসন্ধানী গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর ফ্যাক্ট-চেক ও অনুসন্ধানে এটি ভিন্ন রূপ নিয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির দাবি, একাধিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সংগৃহীত হাই-রেজুলেশনের ভিডিও এবং ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে সেখানে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারসাজির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও ‘এআই’ দাবির ব্যাকগ্রাউন্ড
গত ২৮ জুলাই ২০২৬ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের কিছু ছবি ও একটি শব্দহীন ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই দৈনিক কালবেলা, দেশ রূপান্তর, কালের কণ্ঠ, বাংলানিউজসহ একাধিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, ‘শিবির মিডিয়া সেল’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ও অন্যের শরীরে প্রতিমন্ত্রীর মাথা জুড়ে দিয়ে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রতিমন্ত্রীর বরাতে উল্লেখ করা হয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই এই ডিপফেক বা এআই কনটেন্ট ছড়িয়েছে। এমনকি পঞ্চগড় জেলা বিএনপিও এআই প্রযুক্তির অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে। তবে বিভিন্ন মূলধারার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদগুলোর ভাষা, বাক্য গঠন এবং যুক্তিতে অস্বাভাবিক মিল লক্ষ করা গেছে।
দ্য ডিসেন্টের প্রযুক্তিগত ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান
দ্য ডিসেন্ট তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানায়, তারা পঞ্চগড় ও ঢাকার একাধিক সাংবাদিকের মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো কনটেন্টের চেয়েও উচ্চমানের (হাই-রেজুলেশন) ২০ সেকেন্ডের একটি শব্দহীন ভিডিও, ৫টি ছবি এবং হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটিংয়ের কিছু স্ক্রিনশট সংগ্রহ করে।
প্রযুক্তিগত যাচাই: সংগৃহীত মূল ছবি ও ভিডিও এআই-কনটেন্ট চিহ্নিত করার একাধিক বিশেষায়িত টুলে পরীক্ষা করা হয়। তবে কোনো টুলেই এগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বা বিকৃত করার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
মোবাইল নম্বর ও বিকাশ অ্যাকাউন্ট: হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের স্ক্রিনশটে থাকা বাংলাদেশি মোবাইল নম্বরটির সূত্র ধরে মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ) অ্যাকাউন্টে অনুসন্ধান চালানো হয়। এতে এক অমুসলিম নারীর নাম পাওয়া যায়, যাঁর বাড়ি প্রতিমন্ত্রীর নিজ গ্রাম পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নে।
সংশ্লিষ্ট নারীর বক্তব্য: ওই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ১৯৯৫ সালে জন্মগ্রহণকারী ওই তরুণী স্বীকার করেন, স্ক্রিনশটে থাকা শাড়ি পরিহিত ছবিটি তাঁরই। তবে ভাইরাল ঘটনা বা স্ক্রিনশটে তা কীভাবে এল, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য বা সদুত্তর দিতে পারেননি। প্রতিবেশীদের ভাষ্যমতে, ছোটবেলায় বাবা হারানো এই নারীর পড়াশোনার দায়িত্ব একসময় ফরহাদ হোসেন নিয়েছিলেন।
রহস্যজনক ফোনকল ও ছবি বিশ্লেষণ
দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই নারীর সঙ্গে ফোনে কথা বলার মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ০১৭০৭ সিরিয়ালের একটি নম্বর থেকে কল আসে, যার ট্রু-কলারে নাম ভেসে ওঠে ‘FORHAD HOSSAIN AZAD’। সরকারি ডিরেক্টরিতে ওই নম্বরটি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের সরকারি তালিকাভুক্ত নম্বর হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
পরদিন সকালে সাংবাদিক পরিচয়ে ওই নম্বরে কল করা হলে তিনি বিস্তারিত প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে সাক্ষাৎ করে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানান এবং পরবর্তীতে ‘ব্যস্ত আছেন’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। অন্যদিকে, ওই তরুণীকে প্রতিমন্ত্রীর ফোন দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, তিনি কাউকেই নম্বর দেননি।
এছাড়া সংগৃহীত একটি ছবিতে দেখা যায়, এক নারী অন্তর্বাস পরিহিত অবস্থায় যে ফোন দিয়ে সেলফি তুলছেন, তার ব্যাক-কভারের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের ব্যবহৃত ব্যাক-কভারের হুবহু মিল রয়েছে, যা প্রতিমন্ত্রীর নিজস্ব ফেসবুক প্রোফাইলের পুরোনো ছবিতেও দৃশ্যমান।