ধ্বংসস্তূপের গাজায় ২৫০ জোড়া তরুণ-তরুণীর গণবিয়ে: তাঁবুর জীবনেও নতুন স্বপ্নের বুঁনন

November 7, 2026 | Feature-2 |

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চারপাশে কেবলই ইটের ধ্বংসস্তূপ, স্বজন হারানোর হাহাকার আর ধূলিমলিন বাতাসে যুদ্ধের বিষাদ। দীর্ঘ যুদ্ধ আর অমানবিক পরিস্থিতিতে বিপর্যস্ত গাজা উপত্যকার সেই বিভীষিকাময় বাস্তবতার মাঝেই ফুটে উঠল এক টুকরো আশা ও আনন্দের আলো। ধ্বংসের ক্ষত পেছনে ফেলে নতুন জীবন শুরুর অঙ্গীকারে একসঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন ২৫০ জোড়া ফিলিস্তিনি তরুণ-তরুণী। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই আবেগঘন গণবিয়ের খবর।

স্থানীয় সময় গতকাল শুক্রবার (৬ নভেম্বর ২০২৬) গাজা সিটির ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের ‘সি ক্লাব’ প্রাঙ্গণ সেজে উঠেছিল এক ভিন্ন আমেজে। ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতবিক্ষত গাজার রাস্তায় যেখানে সাধারণত অ্যাম্বুলেন্স আর সামরিক যানের বিকট শব্দ শোনা যায়, সেখানে দেখা গেল উৎসবের দীর্ঘ শোভাযাত্রা। ফিলিস্তিনের জাতীয় পতাকা, তাজা ফুল ও লাল ফিতায় সাজানো গাড়ির বহর যখন ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন স্বজনদের উচ্ছ্বাস আর গাড়ির হর্নে কিছুক্ষণের জন্য হলেও থমকে গিয়েছিল ফিলিস্তিনিদের বুকের চাপা কান্না।

এই অভূতপূর্ব গণবিয়ের আয়োজন করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘অপারেশন শিভালরাস নাইট ৩’। এতে সার্বিক সহায়তায় ছিল সাক্‌র বিন মোহাম্মদ আল কাসিমি চ্যারিটেবল অ্যান্ড হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন। চলমান যুদ্ধ ও চরম আর্থিক সংকটের কারণে গাজার তরুণদের পক্ষে বিয়ের খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বাস্তুচ্যুত ও সর্বস্ব হারানো এই তরুণদের জীবনে স্বাভাবিকতা ফেরাতে এবং নতুন করে বেঁচে থাকার পথ তৈরি করতেই এই মানবিক উদ্যোগ নেওয়া হয়।

আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, গণবিয়ের জন্য মোট ১১ হাজার ৬২২টি আবেদন জমা পড়েছিল। প্রাথমিক বাছাই শেষে ১ হাজার ৩৩৫ জন তরুণকে যোগ্য ঘোষণা করা হয় এবং পরবর্তীতে লটারির মাধ্যমে ২৫০ জন বর ও কনেকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়।

জীবনের পরম আনন্দের দিনেও তরুণ-তরুণীদের চোখে ছিল স্বজন হারানোর গহিন বেদনা। জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের বর সাইদ আল-নাজ্জার জানান, ইসরায়েলি হামলায় তাঁদের পৈতৃক ভিটা সম্পূর্ণ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। বর্তমানে তিনি শরণার্থী শিবিরের একটি প্লাস্টিকের তাঁবুতে বাস করছেন। লটারিতে নাম ওঠার পর তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, “এই আনন্দ শুধু আমার বা এই ২৫০ জনের নয়, এই আনন্দ পুরো গাজাবাসীর জন্য এক নতুন নিঃশ্বাস।”

আরেক বর মোহাম্মদ কুয়াইদিরের অবস্থাও একই রকম। ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ায় নতুন বাসা ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য নেই তাঁর। তাই নতুন জীবনসঙ্গীকে নিয়ে আপাতত উঠবেন একটি সাধারণ তাঁবুতে। কষ্টের তীব্রতার মাঝেও তিনি জানান, এই আয়োজন তাঁদের চরম দুর্যোগের মধ্যেও বেঁচে থাকার অদম্য সাহস ও আলো জুগিয়েছে।

উৎসবের দিনে কান্না ধরে রাখতে পারেননি তরুণ মুনির আল-তাতারি। যুদ্ধের তাণ্ডবে মা ও একাধিক নিকটাত্মীয়কে হারিয়েছেন তিনি। বিয়ের সাজে মায়ের কথা স্মরণ করে মুনির বলেন, “মায়ের খুব ইচ্ছা ছিল আমার বিয়ে দেখার। কিন্তু এত অবরোধ ও স্বজন হারানোর কষ্টের পরও আমরা উৎসব করব। নিজেদের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখব।”

চারপাশের ধ্বংসাবশেষ, প্লাস্টিকের তাঁবু আর বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ের মাঝে অনুষ্ঠিত এই গণবিয়ে যেন পুরো বিশ্বের সামনে গাজাবাসীর এক নতুন বার্তা পৌঁছে দিল—সহিংসতা ও ধ্বংস দিয়ে জীবনকে থামিয়ে দেওয়া যায় না; ভালোবাসার শক্তিতে গাজা আবারও নতুন করে জেগে উঠবে।



Leave a Comment