খোলা মাঠে ঈদের নামাজে বাধা: ভারতে তীব্র আতঙ্কে দিন কাটছে মুসলমানদের

মে ২৭, ২০২৬ | Feature-2 |

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ যেখানে সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে এক করে, সেখানে ভারতে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে এক চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে। দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে এবার উন্মুক্ত বা পাবলিক প্লেসে (যেমন— মাঠ, রাস্তা বা পার্ক) ঐতিহ্যগতভাবে চলে আসা ঈদের জামাত আয়োজনের অনুমতি দিচ্ছে না স্থানীয় প্রশাসন ও কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো। ফলে বাধ্য হয়ে মুসলমানদের ছোট ছোট মসজিদে বা ঘরের ভেতর গাদাগাদি করে নামাজ আদায় করতে হচ্ছে, যা তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় বড় আঘাত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোতে হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা:
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ এবং রাজধানী দিল্লির বেশ কিছু এলাকায় বছরের পর বছর ধরে মুসলমানরা ঈদের দিন বড় বড় মাঠে বা ঈদগাহে নামাজ আদায় করে আসছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) শাসনামলে ‘জনসাধারণের চলাচলে বাধা’ কিংবা ‘নিরাপত্তাজনিত’ অজুহাতে এসব উন্মুক্ত স্থানে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।

নয়াদিল্লির উপকণ্ঠের বাসিন্দা এবং একজন ভুক্তভোগী মুসল্লি আল জাজিরাকে বলেন, “যে মাঠে আমরা গত ২০ বছর ধরে ঈদের নামাজ পড়ে আসছি, এবার সেখানে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে। প্রশাসন বলছে, খোলা জায়গায় নামাজ পড়লে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। আমরা স্বভাবতই এখন নিজেদের দেশে অত্যন্ত ভীত ও অসহায় বোধ করছি।”

কট্টরপন্থীদের হুমকি ও প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব:
স্থানীয় মুসলিম অধিকারকর্মী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করছে স্থানীয় কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর চাপ ও হুমকি। অনেক জায়গায় খোলা মাঠে নামাজ পড়তে গেলে বজরং দল বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো সংগঠনের সদস্যরা এসে বাধা দিচ্ছে এবং ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। অথচ একই এলাকায় অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের জন্য রাস্তা বা মাঠ দিনের পর দিন বন্ধ রাখতে প্রশাসন কোনো আপত্তি করে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ওপর এক বড় ধরনের চপেটাঘাত এবং এর মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়কে জনসমক্ষে তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

মসজিদে উপচে পড়া ভিড় ও ভোগান্তি:
খোলা মাঠ বা ঈদগাহের অনুমতি না মেলায় মুসলমানরা বাধ্য হচ্ছেন পাড়ার ছোট ছোট মসজিদগুলোতে সমবেত হতে। কিন্তু ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মানুষ হওয়ায় তীব্র গরমের মধ্যে কয়েক দফায় ঈদের জামাত আয়োজন করতে হচ্ছে। অনেক বয়োবৃদ্ধ এবং শিশু ভিড়ের কারণে নামাজে অংশই নিতে পারছেন না।

হরিয়ানার গুরুগ্রামের (গুরগাঁও) এক ইমাম বলেন, “আমাদের এখানে মাত্র কয়েকটি অনুমোদিত মসজিদ আছে, যা বিশাল মুসলিম জনসংখ্যার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। খোলা জায়গাগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় মানুষ এখন বাড়ির ছাদে বা ঘরের ভেতরে নামাজ পড়তে বাধ্য হচ্ছে। ঈদের যে সার্বজনীন আনন্দ, তা এই বন্দি পরিবেশে পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে।”

কোণঠাসা করার সুদূরপ্রসারী রাজনীতি:
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, বরং ভারতে মুসলিম সমাজকে পদ্ধতিগতভাবে ‘অদৃশ্য’ করে তোলার একটি রাজনৈতিক কৌশল। গরুর মাংস বহন বা কুরবানির অজুহাতে গণপিটুনি (লঞ্চিং), বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং এখন ধর্মীয় প্রার্থনায় বাধা—সব মিলিয়ে ভারতের ২০ কোটিরও বেশি মুসলিম জনসংখ্যা চরম এক মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই বৈষম্য ও ভীতি ভারতের মুসলমানদের নিজেদের মাতৃভূমিতেই ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ হিসেবে বসবাস করতে বাধ্য করছে, যা এই ঈদে আরও প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে।



Leave a Comment