শিশু রামিসা হত্যা মামলার প্রথম দিনে বাবা-মা ও বোনের সাক্ষ্যগ্রহণ
আদালত প্রতিবেদক: দেশজুড়ে বহুল আলোচিত রাজধানীর পল্লবীর দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসা আক্তারকে পাশবিক ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের মামলায় আজ মঙ্গলবার (২ জুন) প্রথম দিনের আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম দিনেই আদালতে নিহত শিশুর পিতা, মাতা এবং তাঁর ছোট বোনের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে রামিসার বোন শিশু হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞ বিচারক অবরুদ্ধ কক্ষে ‘ক্যামেরা ট্রায়ালে’ তার সাক্ষ্যগ্রহণ করেন।
আজ মঙ্গলবার ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এই সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে গতকাল সোমবার (১ জুন) আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন আদালত।
মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে মায়ের কান্না, আইনজীবীর ভিন্ন দাবি:
আজ সকালে কারাগার থেকে মামলার মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাদের উপস্থিতিতেই একে একে সাক্ষীরা কাঠগড়ায় দাঁড়ান। আদালতে প্রথমে সাক্ষ্য দেন নিহত শিশু রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা (যিনি গতকাল বুকে ব্যথা নিয়ে সিসিইউতে ভর্তি হয়েছিলেন)। তিনি আদালতের কাছে তাঁর অবুজ সন্তানকে হারানোর বিচার চেয়ে শতভাগ ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।
এরপর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রামিসার মা পারভীন আক্তার। তিনি কাঁদতে কাঁদতে আদালতকে বলেন, “রামিসা হত্যা মামলার মূল আসামি সোহেলকে ঘরের গ্রিল কেটে পালিয়ে যেতে সরাসরি সাহায্য করেছিল তার স্ত্রী স্বপ্না। সেদিন ঘরে ঢুকে আমি আমার মেয়ের মাথা একদিকে এবং শরীর আরেকদিকে পড়ে থাকতে দেখি। এই লোমহর্ষক দৃশ্য দেখার সাথে সাথেই আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
তবে রামিসার মায়ের এই সাক্ষ্যগ্রহণের পর আদালত প্রাঙ্গণে এক নজিরবিহীন নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পাবলিক প্রসিকিউটর) দাবি করেন, রামিসার মা পারভীন আক্তার আদালতে যে বয়ান দিয়েছেন তা আংশিক ‘মিথ্যা সাক্ষ্য’। কেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ভুক্তভোগী মায়ের সাক্ষ্যকে মিথ্যা দাবি করলেন, তা নিয়ে আদালত পাড়ায় জোর গুঞ্জন ও আইনি কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে বোনের ক্যামেরা ট্রায়াল:
মামলার তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির করা হয় নিহত রামিসার ছোট বোন রাইসা আক্তারকে। সে অতি অল্প বয়সী ও শিশু হওয়ায় সাধারণ আদালতের পরিবেশ তার ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে— এই বিবেচনায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে একটি বিশেষ আবেদন করা হয়। বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীন আবেদনটি মঞ্জুর করে সাধারণ দর্শকদের সরিয়ে দিয়ে কেবল সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে অবরুদ্ধ কক্ষে (ক্যামেরা ট্রায়াল) শিশু রাইসার সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করেন।
মামলার পটভূমি ও অভিযোগপত্র:
উল্লেখ্য, গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানা পুলিশ ঘাতক দম্পতি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে আদালতে সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণসহ অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। এরপর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত অভিযোগপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে মামলাটি চূড়ান্ত ট্রায়াল বা বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বদলির আদেশ দেন।
পুলিশের দেওয়া এই অভিযোগপত্রে মূল আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে শিশুটিকে প্রথমে পাশবিক ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার সরাসরি অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে স্বামীকে সরাসরি তথ্য গোপন ও পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অপরাধ প্রমাণে এই মামলায় মোট ১৫ জনকে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রথম দিনেই গুরুত্বপূর্ণ ৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলো।