নোয়াখালীতে নিখোঁজের আড়ালে জোড়া খুন: সম্পত্তি লোভে সৎ মা ও শিশুকে হত্যা

নোয়াখালী প্রতিনিধি:  নোয়াখালীতে নিখোঁজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক নৃশংস ও রোমহর্ষক জোড়া হত্যাকাণ্ডের রহস্য দীর্ঘ দুই বছর পর উদঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। কোটি টাকার পৈতৃক সম্পত্তি সম্পূর্ণ নিজেদের দখলে নিতে সৎ মা কমলা খাতুন ও তাঁর শিশু সন্তান নোমানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর প্রায় ২৪ মাস ধরে মাটিচাপা দিয়ে গুম করে রাখার চাঞ্চল্যকর অভিযোগে প্রথম পক্ষের সন্তানসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গ্রেফতারকৃতরা ইতিমধ্যে বিজ্ঞ আদালতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। আজ সোমবার (২৫ মে) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন খান এক সংবাদ সম্মেলনে এই গা শিউরে ওঠা তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পরিবারের ইতিহাস ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ:
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে পূর্বের স্বামীহারা কমলা খাতুন দ্বিতীয়বারের মতো দাম্পত্য জীবন শুরু করেন বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। তাদের সুখের সংসারে জন্ম নেয় একমাত্র পুত্রসন্তান নোমান। আজাদের প্রথম পক্ষের সন্তানদের নিয়ে বড় পরিবারটিতে শুরুতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান থাকলেও, প্রায় সাত-আট বছর আগে আবুল কালাম আজাদের মৃত্যুর পর শুরু হয় কলহ।

মৃত্যুর আগে আজাদ তাঁর প্রায় ৩০ শতাংশ জমি ও বসতবাড়ি দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা খাতুন ও ছোট ছেলে নোমানের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়ে যান, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এই দামী সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নিতে প্রথম পক্ষের সন্তানরা দীর্ঘদিন ধরে কমলা খাতুনের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করে আসছিল।

সাজানো নিখোঁজ ডায়েরি ও মামলার মোড়:
নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে ২০২৪ সালের ১০ মার্চ কমলা খাতুন ও তাঁর ছেলে নিখোঁজ হয়েছেন দাবি করে সোনাইমুড়ী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর। তবে পুরো বিষয়টি প্রথম থেকেই সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ১৪ মার্চ নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন কমলার আপন ছোট বোন রহিমা বেগম। মামলার তদন্তভার প্রথমে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং পরবর্তীতে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সিআইডির নিবিড় অনুসন্ধানে উঠে আসে, ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কমলা খাতুন ও তাঁর ছেলেকে সম্পত্তি লিখে দিতে চরম মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়, যার পরপরই তারা উধাও হয়ে যান। তদন্তের একপর্যায়ে ঢাকা সবুজবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে ভাঙারি মালামালের স্তূপের ভেতর থেকে কমলা খাতুনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করে সিআইডি। আর এই একটি সূত্র ধরেই তদন্তে ব্যাপক অগ্রগতি আসে।

প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গ্রেফতার অভিযান:
দীর্ঘ তদন্ত ও নিখুঁত প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে গত ২১ মে ময়মনসিংহ থেকে প্রথম পক্ষের ছেলে সাইফুল ইসলাম রাজন রাজুকে গ্রেফতার করে সিআইডি। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোনাইমুড়ী এলাকা থেকে মূল পরিকল্পনাকারী জিয়াউর রহমান সাগর ও তাদের অন্যতম সহযোগী আশিকুর রহমান টিপুকে গ্রেফতার করা হয়।

১৫ দিন আগেই গর্ত খনন, অতঃপর ঘুমের ওষুধ খাইয়ে হত্যা:
রিমান্ডে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে আসামিরা স্বীকার করে, সম্পত্তি দখলের চূড়ান্ত নীল নকশা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৫ দিন আগেই তারা বাড়ির পাশের নির্জন পুকুরপাড়ে একটি গভীর গর্ত খুঁড়ে রেখেছিল। ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাতে কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের রাতের খাবারের পানির সঙ্গে অতিরিক্ত মাত্রায় ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। গভীর রাতে মা ও ছেলে সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে পড়লে ঘাতকরা গামছা পেঁচিয়ে, হাত দিয়ে গলা চেপে এবং মুখে বালিশচাপা দিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করে। হত্যা শেষে আলামত ও পরনের কাপড় পুড়িয়ে দিয়ে লাশ দুটি পুকুরপাড়ে আগে থেকে তৈরি গর্তে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

কঙ্কাল উদ্ধার ও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি:
আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৪ মে (রবিবার) সকালে সিআইডি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও বিপুল সংখ্যক এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে ওই পুকুরের পানি সেচ ও মাটি খনন অভিযান চালায়। সেখান থেকে কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের দেহাবশেষ (কঙ্কাল) উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে দেহাবশেষ ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃত তিন আসামিই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজেদের পৈশাচিক অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। কঙ্কাল থেকে ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।



Leave a Comment