ঈদ আনন্দ রূপ নিল বুকফাটা আর্তনাদে, এক ট্রাকেই লাশ হয়ে ফিরছেন চার গ্রামের সন্তানরা

May 25, 2026 | Feature-2 |

নিজস্ব প্রতিবেদক:  আর মাত্র কয়েক দিন পরেই পবিত্র ঈদুল আজহা। সারা দেশ যখন উৎসবের আমেজে মাতোয়ারা, তখনই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ঘটে গেল এক প্রলয়ঙ্করী ও হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনা। ঈদে কম খরচে বাড়ি ফিরতে গিয়ে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন ভাগ্যবিহত নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৯ জন।

আজ সোমবার (২৫ মে) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু পূর্বপাড়ের সরাতৈল এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১৩ জনই নওগাঁর মান্দা উপজেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। নিহতদের মরদেহ বর্তমানে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।

ফেরিওয়ালাদের নিয়তি ও সাড়ে ৫০০ টাকার ট্র্যাজেডি:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হতাহতরা সকলেই অত্যন্ত দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ। তারা নোয়াখালী ও ফেনী শহরের বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ীভাবে বসবাস করে ভ্রাম্যমাণ সাইকেলে ঘুরে নষ্ট মোবাইল, ফেলনা চুল ও হরেক রকম ভাঙারি জিনিসপত্র কেনা-বেচার (ফেরি) ব্যবসা করতেন। ঈদের আনন্দ পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে গত ১৮-২০ দিনের কষ্টার্জিত টাকা পকেটে নিয়ে তারা একযোগে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন।

দূরপাল্লার বাসে অতিরিক্ত ভাড়া এড়াতে তারা ফেনী থেকে উত্তরবঙ্গগামী একটি লোহার রডবোঝাই ট্রাকে জনপ্রতি মাত্র সাড়ে ৫০০ টাকা ভাড়ায় চড়ে বসেন। কিন্তু পথিমধ্যে ট্রাকটি কালিহাতীর সরাতৈল এলাকায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং দ্রুতগামী ট্রাকটি মহাসড়কের পাশে উল্টে যায়।

দুর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া আহত যাত্রী পাবনার শেখ রতন জানান, “ভোরে হঠাৎ করেই ট্রাকটি উল্টে গেলে আমি ছিটকে অনেক দূরে গিয়ে পড়ি। কিন্তু আমার সাথে থাকা বাকিরা সবাই মুহূর্তের মধ্যে ভারী লোহার রডের নিচে চাপা পড়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন এসে আমাদের কয়েকজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।”

নিহত ও আহতদের পরিচয়:
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের সুনির্দিষ্ট পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তারা হলেন—নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটী গ্রামের মো. সুলতানের ছেলে মোহাম্মদ তারেক (২১), মো. সাগর মিয়া (২০), মো. রবিউল ইসলাম (২৫), মো. আব্দুল বারেক, মোহাম্মদ বাদশা, মো. সোহাগ, মোহাম্মদ মইনুর ইসলাম, মোহাম্মদ মাইনুল ও মোহাম্মদ গিয়াস। এছাড়া নিহতদের মধ্যে আরও রয়েছেন নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার মালঞ্চী গ্রামের সারিকুল (২০), রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার বাতানপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেন (১৯), চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার নজরুল ইসলাম (৬০) এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের মামুন (৪৫)।

অন্যদিকে আহতরা হলেন—বাবু (৩৫), সমেজ (২১), আব্দুল রহমান (৩৫), তুহিন (২৪), আলমগীর (৪০), সিদ্দিক আলী (৪০), খোরশেদ (২৬), নয়ন বিশ্বাস (২২) এবং শেখ রতন (৩৫)। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ইটের ঘর তোলা হলো, বরের সাজে ফেরা হলো না তারেকের:
নিহতদের মধ্যে ২১ বছরের তরুণ তারেকের গল্পটি পুরো এলাকাকে কাঁদিয়েছে। দুই ভাই নোয়াখালীতে কষ্ট করে টাকা জমিয়ে মা-বাবার জন্য রাজেন্দ্রবাটী গ্রামে ইটের গাঁথুনি দিয়ে একটি নতুন বাড়ি তৈরি করেছিলেন। ঘরের চালার টিন দেওয়া এখনো বাকি। কথা ছিল ঈদে বাড়ি ফিরলেই ছোট ছেলে তারেককে ধুমধাম করে বিয়ে দেবেন মা-বাবা। কিন্তু বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগেই কাফনের কাপড়ে জড়াতে হলো তাকে।

ছেলের শোকে বারবার মূর্ছা যাওয়া মা মোমেনা বেগম বিলাপ করে বলছিলেন, “ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কত কষ্ট করে ভাঙা বাড়িতে থাকতাম। ছেলেরা আমাদের কষ্টের দিন শেষ করেছিল। আজ সকালে খবর পেলাম আমার ছোট ছেলেটা আর জীবিত বাড়ি ফিরবে না। সে লাশ হয়ে ফিরছে।”

স্তব্ধ চার গ্রাম, স্বজনদের আহাজারি:
নিহতদের অধিকাংশের বাড়ি মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি, মজিদপুর, পাকুড়িয়া ও বাতাসপুর গ্রামে। একই ইউনিয়নের এতগুলো তাজা প্রাণ এক নিমেষে ঝরে যাওয়ায় পুরো এলাকায় শ্মশানের স্তব্ধতা নেমে এসেছে। স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামীণ আকাশ-বাতাস।

মান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, “টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে নিহতের ঘটনায় এখন পর্যন্ত মান্দা উপজেলার ৯ জনের পরিচয় আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি। বাকিদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় শনাক্তে সংশ্লিষ্ট যমুনা সেতু পূর্ব থানার সঙ্গে আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।” আইনি আনুষঙ্গিকতা শেষে মরদেহগুলো দ্রুত পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।



Leave a Comment