সীতাকুণ্ডে উদ্বোধনের আগেই র‍্যাব-পুলিশের নতুন ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিল সন্ত্রাসীরা

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড় পরিবেষ্টিত জঙ্গল সলিমপুরে নবনির্মিত র‍্যাব ও পুলিশের একটি যৌথ ক্যাম্পে গভীর রাতে ভারী ও আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত একদল সন্ত্রাসী অতর্কিত ও ভয়াবহ সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। একে-৪৭ ও এসএমজির মতো মারণাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কয়েকশ দুষ্কৃতকারী পুরো ক্যাম্পটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা উভয়পক্ষের নজিরবিহীন ও প্রচণ্ড গোলাগুলির পর পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উল্লেখ্য, আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বিশেষ ক্যাম্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করার কথা ছিল। এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনার পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে নতুন করে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্প ধ্বংস ও রাস্তা কেটে অবরুদ্ধ:
র‍্যাব ও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রোববার (২৪ মে) দিবাগত রাত ১টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে ক্যাম্পের ভেতরে থাকা সদস্যদের ঘুম ভাঙে। আধুনিক স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে কয়েকশ সন্ত্রাসী চারদিক থেকে পুরো ক্যাম্পটি অবরুদ্ধ করে চারদিকে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করতে শুরু করে। একই সময়ে ঘাতকরা ভারী বুলডোজার নিয়ে এসে সদ্য নির্মিত ক্যাম্পের দেয়াল ও ভেতরের সমস্ত স্থাপনা গুঁড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়।

সুপরিকল্পিত এই হামলার অংশ হিসেবে যৌথ বাহিনীর ব্যাকআপ ফোর্স যেন প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য জঙ্গল সলিমপুরে ঢোকার প্রধান সড়কের একাধিক স্থানের মাটি কেটে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয় সন্ত্রাসীরা। এ সময় তারা আশেপাশের বেশ কিছু সাধারণ নিরীহ মানুষের বসতঘর ও অন্যান্য স্থাপনাতেও ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পরবর্তীতে ক্যাম্পে থাকা র‍্যাব সদস্যদের তীব্র ও পাল্টা প্রতিরোধের মুখে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে রক্তক্ষয়ী গোলাগুলির পর পিছু হটে দুর্গম পাহাড়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।

আরো পড়ুন: চট্টগ্রামে র‍্যাব ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণ, যৌথ বাহিনীর অভিযান

একে-৪৭ ও চাইনিজ রাইফেলে সুপরিকল্পিত হামলা:
র‍্যাব-৭ এর অধিনায়ক (সিও) লেফট্যানেন্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান ঘটনার ভয়াবহতা নিশ্চিত করে জানান, “একে-৪৭, চাইনিজ রাইফেল ও এসএমজির মতো যুদ্ধক্ষেত্রের ভারী অস্ত্র নিয়ে এই সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি সড়ক কেটে ও বুলডোজার ব্যবহার করে আমাদের নবনির্মিত ক্যাম্পটি পুরোপুরি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায় তারা।”

চিরুনি অভিযান ও ২০-২৫ জন আটক:
লোমহর্ষক এই ঘটনার পরপরই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে দ্রুত দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং পুরো জঙ্গল সলিমপুরজুড়ে এক বিশাল চিরুনি অভিযান শুরু করেন। চারদিক অবরুদ্ধ করে চালানো এই অভিযানে ইতিমধ্যেই সন্দেহভাজন ২০ থেকে ২৫ জন সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, “সরকারি ক্যাম্পে হামলার মতো এমন ধৃষ্টতা দেখানো দুর্বৃত্তদের আর কোনো প্রকার ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। এই হামলার মূল হোতাসহ জড়িত প্রতিটি অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”

সন্ত্রাসের পুরনো ইতিহাস:
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরকে নিজেদের অভয়ারণ্য বানাতে সন্ত্রাসীদের এমন মরিয়া চেষ্টা এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে এই জঙ্গল সলিমপুরেই সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় র‍্যাবের ডিএডি মোতালেব নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে গত ৯ মার্চ যৌথ বাহিনীর এক বিশাল ও সফল অভিযানের মাধ্যমে এই পুরো এলাকাকে পুরোপুরি সন্ত্রাসমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্বোধনের ঠিক এক সপ্তাহ আগেই আবারও নিজেদের শক্তির জানান দিল পাহাড়ের অপরাধী চক্র।



Leave a Comment