স্যাটেলাইট চিত্রে উন্মোচিত হলো দক্ষিণ গাজা মুছে ফেলার ভয়ঙ্কর চিত্র

মে ৩১, ২০২৬ | Feature-2 |

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় আগ্রাসন ও ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের পরিধি ব্যাপক আকারে সম্প্রসারণ করছে ইসরায়েলি বাহিনী। আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে খোদ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা ভূখণ্ডের ৭০ শতাংশ এলাকা সামরিক দখলে নেওয়ার জন্য সরাসরি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে ইসরায়েলি বুলডোজার ও সাঁজোয়া যানের নিচে পিষ্ট হয়ে বিশ্ব মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাচ্ছে দক্ষিণ গাজার একের পর এক ঐতিহাসিক ও আবাসিক এলাকা। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা’-র এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট ইমেজ (উপগ্রহ চিত্র) বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই রোমহর্ষক ও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

মানচিত্র থেকে উধাও বোনদের কবর, বসছে ইসরায়েলি ক্যাম্প:

প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মুহান্নাদ কিশতার এক মর্মান্তিক আকুতির কথা তুলে ধরা হয়েছে, যিনি দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে ইসরায়েলি হামলায় নিহত তাঁর দুই বোন রিম ও ওয়ালা-র কবর জিয়ারত করতে ব্যাকুল হয়ে আছেন। কিন্তু বুকফাটা কান্না চেপে তিনি জানান, এখন আর মানচিত্রে তাঁর বোনদের কবরের কোনো অস্তিত্বই অবশিষ্ট নেই। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, খান ইউনিসের মা’আন এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘শেখ মোহাম্মদ কবরস্থান’টি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই সমাধিস্থলের ওপর এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ভারী সাঁজোয়া যান, ট্যাঙ্ক এবং দাঁড়িয়ে আছে তাদের সামরিক তাবু।

যুদ্ধবিরতির ‘হলুদ রেখা’ লঙ্ঘন করে আগ্রাসন:

আল জাজিরা-র স্যাটেলাইট ও ভূখণ্ড বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পূর্ববর্তী যুদ্ধবিরতির শর্তে নির্ধারিত সাময়িক সীমানা বা ‘ইয়েলো লাইন’ (হলুদ রেখা) লঙ্ঘন করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে গাজার আরও ১১ শতাংশ গভীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ফোরেনসিক আর্কিটেকচার এবং প্ল্যানেট ল্যাবসের সংগৃহীত উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গাজার ভেতরে ইসরায়েল অন্তত ৪৮টি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি ও আউটপোস্ট তৈরি করেছে। এর মধ্যে ১৩টি ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছে সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর। এই হলুদ রেখাকে এখন ইসরায়েলের কিছু কট্টরপন্থী কর্মকর্তা ‘নতুন স্থায়ী সীমান্ত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

রাস্তা, পরিখা ও সামরিক দুর্গ নির্মাণ:

সংগৃহীত নতুন স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, দক্ষিণ গাজার রাফাহ এবং খান ইউনিস এলাকায় বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ বা ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে আছে। বিপরীতে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের কাজ। সেন্টিনেল হাবের উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহর মাগাজি শরণার্থী শিবিরের দিকে ইসরায়েলি বাহিনী বিশাল পরিখা এবং মাটির বাঁধ (আর্থ বার্ম) তৈরি করছে। এছাড়া শুজাইয়া এলাকার কৌশলগত আল-মুনতার পাহাড়ের চূড়া সম্পূর্ণ ফাঁকা করে সেখানে স্থায়ী সামরিক দুর্গ ও ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ গাজা উপত্যকার ওপর নজরদারির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। জহুর আদ-দিকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে যুক্ত করতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজার বুক চিরে সম্পূর্ণ নিজস্ব নতুন পাকা রাস্তাও নির্মাণ করেছে।

তথ্য আড়ালের চেষ্টা, স্যাটেলাইটে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা:

গাজার ভেতরের এই ভৌগোলিক পরিবর্তন ও ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে না আসে, সেজন্য তথ্যের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে। মার্কিন সরকারের বিশেষ অনুরোধে শীর্ষস্থানীয় উপগ্রহ চিত্র সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘প্ল্যানেট ল্যাবস’ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপীড়িত অঞ্চলের (বিশেষ করে গাজার) উচ্চ-রেজোলিউশনের স্যাটেলাইট ইমেজ সরবরাহের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের গবেষকদের জন্য গাজায় ইসরায়েলি দখলদারিত্বের সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন ও যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করার পথ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও ফাঁস হওয়া ছবিগুলো স্পষ্ট জানান দিচ্ছে যে, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে গাজাকে একটি জনমানবহীন মরুভূমিতে রূপান্তরের এক পরিকল্পিত নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে তেল আবিব।



Leave a Comment