আজ পর্দা উঠছে ইতিহাসের বৃহত্তম ‘ফুটবল বিশ্বযুদ্ধের’
ক্রীড়া প্রতিবেদক: গত চারটি বছর ধরে গোটা পৃথিবী দেখছে, কোথাও না কোথাও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে। এমনও হয়েছে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে যুদ্ধ থেমে যাওয়ার খবরটা সকালে ঘুম ভাঙার আগেই পালটে গেছে, আবার শুরু হয়েছে নতুন লড়াই। এভাবেই পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষকে ‘যুদ্ধ’ শব্দটা শুনতে শুনতে এক চরম সংঘাতময় বৈশ্বিক আবহবহে বসবাস করতে হচ্ছে। আর এই ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবার যেন ছুঁয়ে গেছে ফুটবল বিশ্বকাপকেও।
মাঠের লড়াই শুরুর আগেই এবারের আসরের ছায়ায় যুদ্ধ আলোচনায় ঢুকে গেছে চিরবৈরী দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যোগ্যতার কঠিন বাছাইপর্ব পেরিয়ে ইরান যেমন বিশ্বকাপে খেলবে, তেমনি অন্যতম প্রধান আয়োজক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও খেলছে ভিন্ন গ্রুপে। যদিও গ্রুপ পর্বের সমীকরণে এই দুই দেশের সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ কম, তবুও দুই দেশের রাষ্ট্রীয় নেতাদের মধ্যে কথার পালটা কথা ও কূটনৈতিক উত্তেজনা থেমে নেই। তবে ফুটবলের মহাসমরে কান দেওয়ার সময় নেই মাঠের যোদ্ধাদের। সবাই এখন বুঁদ হয়ে আছেন বিশ্ব ফুটবলের আসল যুদ্ধে, সবার মগজে এখন কেবলই বিশ্বকাপ।
ইতিহাসের বৃহত্তম আসর: তিন দেশে ৪৮ দল
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করছে বিশ্বকাপ ফুটবলের ২৩তম আসর, যা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল মহোৎসব। এই প্রথম রেকর্ডসংখ্যক ৪৮টি দেশ নিয়ে তিন-তিনটি দেশের যৌথ আঙিনায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফুটবলের এই বিশ্বযুদ্ধ।
আজ মেক্সিকো শহরে বসছে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আসর। এখানেই বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে স্বাগতিক মেক্সিকো এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। মূল ম্যাচের আগে রয়েছে মেক্সিকোর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরার ৯০ মিনিটের এক চোখধাঁধানো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। তবে উৎসবের এই শহরের আড়ালে চলছে তীব্র অসন্তোষও। বিশ্বকাপকে ঘিরে নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন ইতিমধ্যে মেক্সিকো সিটিতে আন্দোলনে নেমেছে। তাদের সাফ হুঁশিয়ারি—নিজেদের দাবিদাওয়া পূরণ না হলে তারা ফুটবল মাঠে গড়াতে দেবে না।
ভেদাভেদহীন এক মঞ্চ: যেখানে ভাষা শুধুই ফুটবল
অলিম্পিক গেমস যেমন এক পাক্ষিক উৎসব, বিশ্বকাপ ফুটবলও তেমনি এক মহামিলনমেলা। তবে মাঠের বাইরে এটি উৎসব হলেও ভেতরে এটি মূলত বিশ্ব ফুটবলের এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ম্যাচ ঘিরে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দিনমজুর—সবাই মেসি, নেইমার কিংবা রোনালদোর পারফরম্যান্স নিয়ে কথার যুদ্ধ ও পাণ্ডিত্য দেখাতে ভালোবাসেন। এই ফুটবল বিশ্বকাপে কোনো জাতপাত নেই, কোনো ধর্ম-বর্ণের বিভেদ নেই। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ এক জায়গায় আসেন, নানান দেশের ফুটবলাররা এক মঞ্চে লড়াই করতে আসেন, কিন্তু তাদের মধ্যে থাকে না কোনো ভেদাভেদ। সবার ভাষা এখানে একটাই—‘ফুটবল’।
আয়োজনের সিংহাসনে যুক্তরাষ্ট্র
ইতিপূর্বে ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে এবং ১৯৯৪ সালে এককভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এবার তিন দেশ যৌথভাবে দায়িত্ব নিলেও এই বিশ্বকাপের সিংহভাগ কলকাঠি ও আর্থিক লাভ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পকেটেই যাচ্ছে। ফাইনালসহ টুর্নামেন্টের মোট ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ৭৮টি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। বিশ্বমানের ১৬টি নির্বাচিত স্টেডিয়ামের মধ্যে ১১টিই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে মেক্সিকোতে দুটি এবং কানাডার ভ্যাংকুভার ও টরন্টো মিলিয়ে রয়েছে তিনটি স্টেডিয়াম। তাই বিশ্বকাপের মূল আয়োজনের আসল মালিক বলাই যায় যুক্তরাষ্ট্রকে। আকর্ষণীয় সব মহারণ আয়োজনের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে তারা। বিশেষ করে গ্লোবাল ফুটবল উন্মাদনার দুই মূল চালিকাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের গ্রুপ পর্বের ছয়টি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ভেন্যুতে।
মেধার লড়াইয়ে মেসি, স্বপ্নপূরণে মরিয়া রোনালদো
বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজর বরাবরের মতোই থাকবে লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং নেইমারের দিকে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তাদের চতুর্থ ট্রফির খোঁজে মহাতারকা মেসির নেতৃত্বে মাঠে নামবে। বয়স ৪০ ছুঁইছুঁই হওয়ার পরও মেসি এখনো মাঠের সবুজ ঘাসে তরতাজা। তবে এবারের বিশ্বকাপে তারুণ্যের গতির চেয়ে বেশি টিকবেন তাঁর অবিশ্বাস্য মেধার লড়াইয়ে। কীভাবে নকআউট বা বড় ম্যাচ জিততে হয়, সেই জাদুকরী মন্ত্র এই বরপুত্র ভালো করেই জানেন।
অন্যদিকে, পর্তুগিজ যুবরাজ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর কাছে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্নটা হয়তো আজীবনের জন্য অধরাই থেকে যাবে, যদি না এবার তাঁর দল পর্তুগাল বাজিমাত করতে পারে। আর ব্রাজিলিয়ান পোস্টার বয় নেইমার বর্তমান সময়ে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে ইনজুরি ও মাঠের বাইরের আলোচনাতেই বেশি জড়িয়ে আছেন। তবে চোট কাটিয়ে উঠে তিনি সেলেসাওদের হেক্সা বা ষষ্ঠ ট্রফি এনে দিতে পারবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
পাশাপাশি ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপের ক্ষিপ্রতা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। গত বিশ্বকাপের ফাইনালে ২-০ তে পিছিয়ে থাকার পরও যিনি হ্যাটট্রিক করে ম্যাচ জমিয়ে দিয়েছিলেন, সেই চিতাবাঘের মতো ক্ষিপ্রগতির এমবাপে এবারও ট্রফি ছিনিয়ে নিতে প্রস্তুত। মেসি-রোনালদোর বিদায়ের পর নতুন কোনো তারকা সেই সিংহাসনে বসতে পারবেন কি না তা বলা কঠিন হলেও, নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড এবং স্পেনের বিষ্ময় বালক লামিন ইয়ামাল তরতাজা রক্ত নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের চেনাতে এবং রাজত্ব তৈরি করতে এবার মাঠে নামছেন।
বিতর্ক ও কালিমার অন্য পিঠ
বিশ্বক্যাপ মাঠে গড়ানোর আগেই অফ-দ্য-ফিল্ড বেশ কিছু বিতর্কিত ও হেনস্তামূলক ঘটনা জন্ম দিয়েছে তীব্র ক্ষোভের। বিশ্বের অনেক দেশের সাধারণ দর্শক চড়া দামে টিকিট কেটেও যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি। এমনকি ফিফার ম্যাচ পরিচালনা করতে যাওয়া সোমালিয়ার রেফারিকে মায়ামি বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ফেরত পাঠানো হয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ভিসা পাননি, অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে গিয়ে চূড়ান্ত হেনস্তার শিকার হয়েছেন। ইরানি ফুটবলারকে দীর্ঘ ৭ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শর্তসাপেক্ষে বিমানবন্দর থেকে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে এবং অনেক ক্যামেরাম্যানকে সরাসরি ‘গো ব্যাক’ বলে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
আমেরিকার মাটির এই রূপ অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে এই যুক্তরাষ্ট্রের মাঠেই ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনার গায়ে ডোপিংয়ের ডার্টি বা কলঙ্কের ছাপ লাগিয়ে তাঁর আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের সর্বনাশ করে দেওয়া হয়েছিল। এই যুক্তরাষ্ট্রেই দেশের হয়ে ওন গোল (নিজেদের জালে গোল) করার খেসারত হিসেবে কলম্বিয়ান ডিফেন্ডার এসকেবারকে নিজ দেশে ফিরে প্রকাশ্য রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছিল।
আজ সেই মার্কিন মুলুক ও তার দুই প্রতিবেশীর আঙিনায় শুরু হচ্ছে নতুন আদলের প্রথম মহাবশ্বকাপ। বিতর্ক, হেনস্তা আর যুদ্ধের আবহাবহে ফুটবলপ্রেমীদের একমাত্র ও পরম প্রত্যাশা—আগামী ১৯ জুলাই ফাইনাল ম্যাচ শেষের পর সব ক্লেদ, রাজনীতি ও হিংসা ছাপিয়ে আবার এক সুন্দর ও শান্তিময় পৃথিবী গড়ে তুলবে এই সুন্দর খেলা (The Beautiful Game)।
আজকের ও আগামীকালের খেলার সময়সূচি:
আজকের খেলা:
মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা | রাত ১টা (উদ্বোধনী ম্যাচ)
আগামীকালের খেলা (শুক্রবার):
দক্ষিণ কোরিয়া বনাম চেক প্রজাতন্ত্র | সকাল ৮টা
কানাডা বনাম বসনিয়া | রাত ১টা