হরমুজ প্রণালীতে নতুন উত্তেজনার মাঝেই আমেরিকা-ইরান শান্তি চুক্তির আভাস
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট ‘হরমুজ প্রণালী’র কাছে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই চিরবৈরী দুই দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার জোরালো আভাস মিলছে। দুই পক্ষের মধ্যস্থতাকারীদের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে।
একদিকে চুক্তির বার্তা, অন্যদিকে ড্রোন হামলা:
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস ধরে চলা সংঘাত অবসানে পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি—উভয় পক্ষই চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
কিন্তু এই কূটনৈতিক অগ্রগতির সমান্তরালেই হরমুজ প্রণালী ও ওমান উপকূলে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। অতি সম্প্রতি ওমান উপকূলে ভারতীয় ক্রু-সংবলিত তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে রহস্যময় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে একটি হামলায় ৩ জন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এর পেছনে ইরানের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন। তবে এই উত্তেজনা সত্ত্বেও দুই পক্ষই শান্তি আলোচনা থেকে পিছিয়ে যায়নি।
কী আছে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিতে?
কূটনৈতিক সূত্র এবং থিংক-ট্যাংক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’ (CFR)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তিতে মূল ফোকাস করা হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর। চুক্তির প্রধান দিকগুলো হলো:
১. ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালী উন্মুক্তকরণ: চুক্তির আওতায় প্রাথমিকভাবে অন্তত ৬০ দিনের জন্য সব ধরনের বৈরিতা ও যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে। ইরান আগামী ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী থেকে সমস্ত মাইন অপসারণ করে এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে। বিনিময়ে আমেরিকা ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেবে।
২. হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ: ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম আইআরএনএ (IRNA) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ইরান নিজের হাতেই রাখবে এবং কোনো টোল বা শুল্ক আদায় করবে না।
৩. পরমাণু কর্মসূচি স্থগিতের রোডম্যাপ: ইরান আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের জন্য তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখতে এবং পরমাণু স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতে সম্মত হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার যাচাইকরণ ও চূড়ান্ত রূপরেখা আগামী ৬০ দিনের পরবর্তী আলোচনায় নির্ধারিত হবে।
৪. আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধ বন্ধ: লেবানন ফ্রন্টসহ (হিজবুল্লাহ) সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করার বাধ্যবাধকতা থাকবে এই চুক্তিতে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি সংগঠনগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে।
৫. অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও তহবিল: মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট করেছেন, চুক্তি স্বাক্ষর বা বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য ইরানকে কোনো ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ তহবিল ফেরত দেওয়া হবে না। ইরান চুক্তির শর্ত ও প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণ রক্ষা করার পর পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারে স্বস্তি:
এদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শান্তি চুক্তির এই খবর আন্তর্জাতিক বাজারে আসতেই বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিবাচক সাড়া পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে দেওয়া এক বিবৃতিতে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক হারে হ্রাস পাবে। ইতিমধ্যে বৈশ্বিক শেয়ার বাজার ১০০০ পয়েন্টের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। ট্রাম্প বলেন, “চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সাথে সাথেই হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হবে। আর তেলের দাম কমলে বিশ্বজুড়ে সবকিছুর দামই কমে আসবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন ও ভারতীয় জাহাজের ওপর ড্রোন হামলার ঝুঁকি এবং অন্যদিকে হোয়াইট হাউস ও তেহরানের মধ্যকার এই হাই-স্টেক কূটনৈতিক দাবার চাল—আগামী কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখতে পুরো বিশ্ব এখন গভীর অপেক্ষায়।