স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপোষ নয় : ডা. শফিকুর রহমান

June 14, 2026 | Feature-2 |

সিলেট ব্যুরো: জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থে জামায়াত কোনো দিন কোনো আপোষ করবে না। আমাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ হাসিমুখে ফাঁসির কাষ্ঠে জীবন দিয়েছেন, কিন্তু পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের সাথে কোনো আপোষ করেননি।

আজ রোববার (১৪ জুন) রাতে সিলেট সার্কিট হাউসে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও সিলেটে কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

বিরোধী দলীয় নেতা দৃঢ়তার সাথে বলেন, “দেশ ও জনগণের প্রতি আমাদের গভীর দায়বদ্ধতা রয়েছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আমরা কোনোভাবেই পিছপা হব না। গণরায় বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করেই ছাড়ব। এ ব্যাপারে সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে আন্দোলন চলবে।”

ভালো নির্বাচন হলেই ভালো শাসক হওয়ার প্রমাণ নেই:

বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমীর বলেন, ভালো নির্বাচন হলেই ভালো শাসক হওয়ার প্রমাণ মেলে না। রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে বর্তমান সরকার জুলাই সনদকে চরমভাবে উপেক্ষা করেছে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া ঐতিহাসিক গণভোটের রায়কে বাতিল করেছে। সীমান্তে অব্যাহত উত্তেজনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ওপার থেকে প্রতিনিয়ত উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। আমরা দুই দুইবার স্বাধীন হলাম, কিন্তু প্রকৃত স্বাধীনতা পেলাম কী? জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমরা কোনো আপোষ করব না।

গৃহযুদ্ধ এড়াতে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছিলাম:

নির্বাচনের ফলাফলে কারসাজির অভিযোগ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা সাড়ে ১৭ বছর একটা কঠিন ও অন্ধকার অবস্থা অতিক্রম করেছি। এরপর জাতি একটি অর্থবহ নির্বাচন আশা করেছিল। আমার ব্যক্তিগত মত, নির্বাচন সুন্দর হয়েছে; কিন্তু ফলাফল সুন্দর হয়নি। ফলাফলে অনেক কিছু করা হয়েছে, যা এখন অনেকে নিজে থেকেই স্বীকার করছেন। তবে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমরা সেই ফলাফল মেনে নিয়েছিলাম। কারণ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন মেনে না নিলে দেশে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা ছিল। আর যেসব দেশে একবার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে, তারা আর সহজে তা থেকে বের হতে পারেনি।”

বেনজীরের আটক দেশের পুলিশের কৃতিত্ব নয়, ইন্টারপোলের:

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়া প্রসঙ্গে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, “বেনজীরকে আটক করা দেশের পুলিশের কোনো কৃতিত্ব নয়, এটি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কৃতিত্ব। কারণ তাঁর বিরুদ্ধে রেড অ্যালার্টও বর্তমান সরকার জারি করেনি। তবে বেনজীর আটক হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটা বড় অর্জন। কিন্তু তিনি দুবাইয়ের কারাগারে থাকবেন নাকি তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, তা এখন সম্পূর্ণ সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।”

সংসদকে ‘মমতাজের সংসদ’ বানাতে চাই না:

সংসদে নিজেদের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডা. শফিক বলেন, সংসদে বিরোধী দল কখনো চরমপন্থা বা গরমপন্থা অবলম্বন করবে না, বরং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে। আমরা সংসদকে আর ‘মমতাজের সংসদ’ বানাতে চাই না। আজকেও সংসদে একজন সংসদ সদস্য দাঁড়িয়ে আল্লাহর পবিত্র বিধান পর্দার বিরুদ্ধে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। সরকারি দল ইতোমধ্যে স্পষ্টভাবে জাতির সাথে দেওয়া ওয়াদা লঙ্ঘন করেছে দাবি করে তিনি বলেন, জনগণের রায় ব্যর্থ হলে টেকসই গণতন্ত্র বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তবে সরকার দায়িত্বশীল আচরণ করলে দেশ ভালো থাকবে।

প্রস্তাবিত বাজেট ও পুশইন প্রসঙ্গ:

ঘোষিত প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাজেটে অনেক কিছুতে ওয়েভার (ছাড়) এসেছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও মোটরসাইকেলের ওপর সরকার শেষ পর্যন্ত কর বসাবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। সবচেয়ে বড় বিষয়, দুর্নীতি বন্ধ আর দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে কি না—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কোনো স্পষ্ট উল্লেখ এই বাজেটে নেই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এ দেশে ১ কোটি মানুষ ট্যাক্স দেওয়ার মতো যোগ্য আছেন, তাহলে শুধু ৩৪ লাখ মানুষ কেন ট্যাক্স দেবেন?

সীমান্তে পুশইন এবং উত্তেজনা সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ বিজিবির সহযোগী। তবে উসকানির সৃষ্টি হয় এমন কোনো কাজ আমরা কখনোই মেনে নেব না। সেটা যদি মুসলমানরা করে, তাও মেনে নেব না; অন্য ধর্মের কেউ করলেও মেনে নেব না। এ দেশ আমাদের সবার। যা করলে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা হয়, সেটাই করতে হবে এবং সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

সিলেট মহানগর জামায়াতের নেতৃবৃন্দের পরিচালনায় উক্ত মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ও উপস্থিত ছিলেন—জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সিলেট জেলা আহ্বায়ক জুনেদ আহমদ ও মহানগর আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান আফজাল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সিলেট মহানগর সভাপতি মাওলানা এমরান আলম, লেবারপার্টির সিলেট মহানগর সভাপতি মাহবুবুর রহমান খালেদ, এলডিপির সিলেট জেলা সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন লিটন, জাগপা সিলেট মহানগর সভাপতি শাহজাহান আহমদ লিটন, সিলেট মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর ড. নুরুল ইসলাম বাবুল, জেলা নায়েবে আমীর অধ্যাপক আব্দুল হান্নান, মহানগর সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী ও জেলা সেক্রেটারি মো. জয়নাল আবেদীন প্রমুখ।



Leave a Comment