বগলদাবা বিরোধী দল হবো না, সংসদের প্রতি মিনিটে খরচ পৌনে ২ লাখ টাকা: ডা. শফিকুর রহমান
সংসদীয় প্রতিবেদক: জাতীয় সংসদে গঠনমূলক, যুক্তিনির্ভর ও সম্পূর্ণ জনস্বার্থভিত্তিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন বিরোধী দলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “অতীতের মতো আমরা সরকারঘেঁষা ‘বগলদাবা’ বিরোধী দল হবো না, আবার অকারণ হট্টগোল ও দীর্ঘমেয়াদি ওয়াকআউট-নির্ভর সংসদ বর্জনের সস্তা রাজনীতিতেও জামায়াত থাকবে না। জনগণের স্বার্থের বাইরে সংসদের মূল্যবান সময়ের একটি মিনিটও আমরা অপচয় করতে চাই না।”
আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে জাতীয় সংসদের এলডি (LD) হলে সংসদ সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ মতবিনিময় সভায় জামায়াত আমির এসব কথা বলেন।
অতীতের সংসদ ও জামায়াতের ভিন্ন অবস্থান:
ডা. শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে বিগত কার্যকালের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদে কোনো কার্যকর বিরোধী দল ছিল না। সরকারি দলই ছলে-বলে-কৌশলে কার্যত নিজেদের অনুগতদের বিরোধী দলের ভূমিকায় বসিয়েছিল, এমনকি বিরোধী দলের নেতা কে হবেন—তাও সরকারি দলের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করত। অন্যদিকে, আরেক ধরনের বিরোধী দল আমরা দেখেছি, যারা সংসদের ভেতর ফাইল ছোড়াছুড়ি, অশালীন ও উত্তেজনাকর আচরণ করে দিনের পর দিন সংসদ বর্জন করে রাখত। জামায়াত এই দুই মেরুর ক্ষতিকর রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে।” তিনি যোগ করেন, “জনগণ আমাদের সংসদে পাঠিয়েছে তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য। তাই আমরা সংসদের ভেতরে ও বাইরে সর্বদা ‘রিজনেবল অ্যান্ড লজিক্যাল’ (যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত) থাকব।”
জনস্বার্থে সংসদে জামায়াতের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ নোটিশ:
১. গণভোট ও জনরায়: গণভোটে জনগণের দেওয়া ঐতিহাসিক রায়ের ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ে জাতীয় সংসদের এই বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের দাবি জানিয়ে প্রথম নোটিশ।
২. ব্যাংকিং ও স্টক মার্কেট ধস: দেশের ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া স্টক মার্কেট এবং ভেঙে পড়ার মুখে থাকা ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম রুখতে ও সংস্কারের দাবিতে দ্বিতীয় নোটিশ।
৩. প্রবাসী টাস্কফোর্স গঠন: রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রবাসীদের নানামুখী সমস্যা সমাধানে একটি কার্যকর ‘সংসদীয় টাস্কফোর্স’ গঠনের প্রস্তাব সংবলিত তৃতীয় নোটিশ।
৪. সীমান্ত পুশইন ও সার্বভৌমত্ব: ভারত সীমান্তে অব্যাহত ‘পুশইন’ ইস্যুতে কড়া প্রতিবাদের নোটিশ। সংবেদনশীল অজুহাতে সরকার এটি প্রত্যাহারের অনুরোধ করলেও জামায়াত তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে তা কার্যসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়।
অর্থবছরের পরিবর্তন ও বাজেট লুটপাটের সমালোচনা:
চলতি বাজেট অধিবেশনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সম্পূরক বাজেট মার্চ মাসে উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকার তা জুনের মাঝামাঝি এনেছে। ইতিমধ্যেই খরচ হয়ে যাওয়া ৫৬ হাজার কোটি টাকার সম্পূরক বাজেটের ওপর এখন সংসদে নামমাত্র অনুমোদন নেওয়া হচ্ছে। মে মাসের শেষে তড়িঘড়ি করে এডিপি (ADP) বরাদ্দ দিয়ে জুনের মধ্যেই অর্থ ব্যয়ের যে সংস্কৃতি দেশে চালু রয়েছে, তা মূলত এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি করে। বর্ষাকালে তাড়াহুড়ো করে করা উন্নয়নকাজের মানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এই চরম অপচয় রুখতে এবং বর্ষাকালীন নিম্নমানের কাজ বন্ধ করতে বাংলাদেশের অর্থবছর বর্তমান ‘জুলাই-জুন’ পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্বের বহু দেশের মতো ‘জানুয়ারি-ডিসেম্বর’ করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সংসদের প্রতি মিনিট পরিচালনায় রাষ্ট্র ও জনগণের প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তাই ব্যক্তিগত চরিত্রহনন, দলীয় কাদা ছোঁড়াছুড়ি বা অযথা তোষামোদি-স্তুতির মাধ্যমে জনগণের ট্যাক্সের এই বিপুল অর্থ অপচয় করার অধিকার কারও নেই।
সংবিধান সংস্কার ও ‘মিলমিশের সংসদ’ বিতর্ক:
এটি সরকারের সাথে কোনো ‘মিলমিশের সংসদ’ কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির মৃদু হেসে বলেন, “আমরা অকারণ সংঘাত বা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংসদ বর্জনে যাব না। কোনো যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করা হলে আমরা সাময়িক ওয়াকআউট করতে পারি। যদি এটাকে কেউ মিলমিশ বলেন, বলুন; আর যদি এটাকেই পরিপক্ব সংসদীয় পারফরম্যান্স বলেন, সেটাই আমাদের পারফরম্যান্স।” সংবিধান প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে, দেশের জনগণের মূল দাবি ছিল সংবিধানের সামগ্রিক ‘সংস্কার’, কোনো আংশিক ‘সংশোধন’ নয়। তাই সংবিধান সংস্কারের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হলে জামায়াত তাতে অংশ নেবে, তবে সাধারণ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশোধন করার জন্য আলাদা কমিটির প্রয়োজন নেই।
উক্ত মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, সাইফুল আলম খান মিলন, শাহজাহান চৌধুরী, গাজী নজরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এবং ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধানসহ দলের শীর্ষ সংসদীয় নেতৃবৃন্দ।