রামপুরা গণহত্যা মামলা: ডিএমপির সাবেক প্রধানসহ ৩ পুলিশের সর্বোচ্চ সাজা
আদালত প্রতিবেদক: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক নিরীহ তরুণকে নির্মমভাবে গুলি করা এবং দুজনকে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ সাজা ‘মৃত্যুদণ্ড’ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে বাকি দুজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও আর্থিক শাস্তি দেওয়া হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ট্রাইব্যুনালের অধীনে এটিই প্রথম বড় কোনো হাইপ্রোফাইল মামলার রায়।
আজ রোববার (২৮ জুন) দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিশেষ বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন।
একনজরে ট্রাইব্যুনালের রায় ও দণ্ডপ্রাপ্তদের বিবরণ (২৮ জুন ২০২৬):
রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায়ে যাদের সাজা দেওয়া হয়েছে, তাদের তালিকা:
| দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম ও পদবি | ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ঘোষিত সাজা | মামলার অপরাধের বিবরণ |
| ১. হাবিবুর রহমান (সাবেক কমিশনার, ডিএমপি) | মৃত্যুদণ্ড | জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রামপুরায় নির্বিচারে গুলি ও গণহত্যার মূল নির্দেশদাতা। |
| ২. মো. রাশেদুল ইসলাম (সাবেক এডিসি, খিলগাঁও জোন) | মৃত্যুদণ্ড | মাঠপর্যায়ে সরাসরি যুক্ত থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বাস্তবায়ন। |
| ৩. মো. মশিউর রহমান (সাবেক ওসি, রামপুরা থানা) | মৃত্যুদণ্ড | কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি এবং হত্যার মূল ক্ষেত্র প্রস্তুত ও গুলিবর্ষণ। |
| অন্যান্য ২ জন আসামি (তদন্তের স্বার্থে নাম অপ্রকাশিত) | বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড | অপরাধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা। |
সেই লোমহর্ষক ‘কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি’:
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নৃশংস ও নির্মম ঘটনাটি ঘটেছিল রাজধানীর রামপুরায়। প্রাণ বাঁচাতে ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক নিরস্ত্র তরুণের ওপর যেভাবে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছিল এবং পরবর্তীতে আরও দুজনকে হত্যা করা হয়েছিল, তা মানবতাবিরোধী অপরাধের সামিল। পুলিশ বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থেকে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তারা এই গণহত্যার নির্দেশ দিয়ে ও সরাসরি অংশ নিয়ে আইনের চরম লঙ্ঘন করেছেন। ট্রাইব্যুনাল স্পষ্ট জানান, এই রায় ভবিষ্যতে যেকোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার ও নাগরিক হত্যার বিরুদ্ধে একটি কঠোর দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।
আদালত প্রাঙ্গণে কড়া নিরাপত্তা, স্বস্তির নিঃশ্বাস:
আজ সকাল থেকেই এই রায়কে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ জুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার রায় পড়া শুরু করার পর আদালত কক্ষে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে।
মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরপরই আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য, আইনজীবী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক উল্লাস প্রকাশ করেন এবং ‘শহীদদের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা এই রায়কে ‘ন্যায়বিচারের এক অনন্য দলিল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন।