জুলাই বিপ্লব ১৮ কোটি মানুষের অর্জন: নজরুল ইসলাম

চট্টগ্রাম ব্যুরো: জুলাই বিপ্লব কোনো একক দল, গোষ্ঠী বা মতাদর্শের নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ১৮ কোটি শোষিত মানুষের সুদীর্ঘ সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক অর্জন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরী আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, জুলাইয়ের রাজপথে অকাতরে প্রাণ দেওয়া প্রতিটি শহীদ এই জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ এবং তাদের এই মহান আত্মত্যাগকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ফ্রেমে বন্দি বা দলীয়করণ করার চেষ্টা করা হলে, তা হবে জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

আজ সোমবার (৬ জুলাই) বিকাল ৫টায় বন্দরনগরীর জামালখানস্থ ফেডারেশনের মহানগরী মিলনায়তনে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম মহানগরের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। “জুলাই বিপ্লবে শ্রমিকদের আত্মত্যাগ ও অবদান” শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি এস এম লুৎফর রহমান এবং যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন মহানগর সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও চসিক মেয়র প্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে নগর আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান—বাঙালির প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বীর চট্টলা সবসময় অগ্রণী ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অন্যায়, বৈষম্য ও দীর্ঘদিনের চেপে বসা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের আপামর জনতা সবসময় সাহসিকতার সঙ্গে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই নেতৃত্ব বজায় রাখবে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অকুতোভয় ছাত্রদের অদম্য নেতৃত্বের পাশাপাশি দেশের খেটে খাওয়া মেহনতি শ্রমিক, সাধারণ জনগণ ও পেশাজীবীদের স্বতঃস্ফূর্ত ও গণমুখী অংশগ্রহণই মূলত এই আন্দোলনকে চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিল। এই নজিরবিহীন ঐক্যবদ্ধ গণসংগ্রামের ফলেই দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের অবসান ঘটেছে। তাই জুলাইকে কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে, একে জাতীয় মুক্তি ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক যুগান্তকারী গণজাগরণের মাইলফলক হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

তিনি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জুলাই আন্দোলনে অসংখ্য বীর সন্তান শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করলেও তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারের আত্মত্যাগের যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন এখনো সম্পন্ন হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। জুলাইয়ের সকল শহীদকে অবিলম্বে সাংবিধানিক মর্যাদা প্রদান, গণঅভ্যুত্থানের ঘোষিত মূল লক্ষ্যগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন এবং দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা পূরণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। গণভোটে প্রকাশিত জনগণের মূল আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়ে ‘জুলাই সনদ’ দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের প্রধান নৈতিক দায়িত্ব। মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, শহীদ ফারুক হোসেন, ওয়াসিম আকরাম ও ফয়সাল আহমদ শান্তসহ প্রতিটি শহীদের রক্তের মূল্য সমান; তাঁদের পরিচয় কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে নয়, তাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের গর্বিত ও চিরস্মরণীয় সন্তান। চট্টগ্রামের জুলাই শহীদদের একটি বড় অংশই ছিলেন দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ, যা প্রমাণ করে দেশের প্রতিটি ক্রান্তিকালে শ্রমিক সমাজের অবদান কতটা অপরিসীম। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়েই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে।

সমাপনী বক্তব্যে সভাপতির আসনে থাকা শ্রমিক নেতা এস এম লুৎফর রহমান বলেন, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের পবিত্র আত্মত্যাগকে অন্তরে ধারণ করে মেহনতি শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আগামী দিনে আরও বেগবান ও শক্তিশালী করতে হবে। শ্রমিক সমাজের ন্যায্য অধিকার, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা না গেলে জুলাইয়ের বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রামে শহীদ হওয়া ফারুক হোসেনের স্ত্রী, সন্তান এবং আন্দোলনে গুরুতর আহত আবদুল আজীজ, শাহাদাত হোসেন মানিক ও জাহাঙ্গীর মুহুরীকে সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।

সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের মহানগর সহ-সভাপতি মকবুল আহমেদ ভূঁইয়া, জুলাই ঐক্য চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়কারী আবরার হাসান রিয়াদ, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি মাহবুবুল আলম, ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক হামিদুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুন্নবী, দপ্তর সম্পাদক স. ম. শামীম, ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম এবং পাঠাগার সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।



Leave a Comment