চট্টগ্রামে জামায়াতের জরুরি বৈঠক: ৯-১৫ জুলাই ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সপ্তাহ’ ঘোষণা

চট্টগ্রাম ব্যুরো: টানা ভারী বর্ষণ, জোয়ারের পানি ও পাহাড়ধসে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করায় উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে আগামী ৯-১৫ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সপ্তাহ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরী শাখা।

আজ বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন পাহাড়তলী এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের প্রধান কার্যালয় বাংলাদেশ ইসলামিক একাডেমি (বিআইএ)-এর কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত এক জরুরি ও বিশেষ সাংগঠনিক বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরীর আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম।

সভাপতির বক্তব্যে তিনি অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, কয়েক দিনের অবিরাম অতিবৃষ্টি এবং সাগরের জোয়ারের পানির ডবল আঘাতে চট্টগ্রাম নগরীর বিস্তীর্ণ ও নিচু এলাকাগুলো সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা ও দেয়ালধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি নগরীর রহমান নগর এলাকায় এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, আগামী কয়েকদিনও চট্টগ্রামে এই ভারী বর্ষণের ধারা অব্যাহত থাকতে পারে, যা চলমান বন্যা ও দুর্যোগ পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও সংকটময় করে তুলবে।

মহানগরী আমীর বর্তমান দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে নগরীর বাকলিয়া, বায়েজিদ, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, চকবাজার, খাতুনগঞ্জ, ডবলমুরিং, পতেঙ্গা, হালিশহরসহ বিভিন্ন প্রধান প্রধান ও আবাসিক এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। এতে হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে এবং অসংখ্য বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রধান সড়কগুলো জলমগ্ন থাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সড়ক ও রেলপথ ডুবে যাওয়ায় চট্টগ্রামের সাথে আশেপাশের জেলা ও উপজেলাগুলোর যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আকস্মিক এই বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চলমান এইচএসসি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাময়িক ও ষান্মাসিক পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে এবং পাহাড়ের পাদদেশে অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সিডিএ ও চসিকের জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পগুলো কার্যকর জবাবদিহিতার অভাবে এখন একটি ‘নেভার এন্ডিং’ বা শেষহীন তামাশার প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন ও ওয়ার্ডসমূহে বর্তমানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও নগরবাসী কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি জেলা প্রশাসনের প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের গতি বাড়াতে জোর দাবি জানান এবং একই সঙ্গে দলীয় নেতা-কর্মী, স্থানীয় সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামার নির্দেশ দেন।

চট্টগ্রামের এই চরম মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় এবং ঘোষিত ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সপ্তাহ’ সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে বৈঠকে তাৎক্ষণিকভাবে ১৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি শক্তিশালী ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে চট্টগ্রাম মহানগরী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ নুরুল আমিনকে আহ্বায়ক, অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মোহাম্মদ উল্লাহকে যুগ্ম আহ্বায়ক এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে জামায়াত মনোনীত মেয়রপ্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালীকে সদস্য সচিবের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন নগর সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. এ কে এম ফজলুল হক, সাবেক কাউন্সিলর শফিউল আলমসহ চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৪টি সাংগঠনিক থানার সম্মানিত সেক্রেটারিবৃন্দ। উক্ত উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ফয়সল মুহাম্মদ ইউনুস ও মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী, ডা. সিদ্দিকুর রহমান, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি এস. এম. লুৎফর রহমান, অফিস সম্পাদক হামেদ হাসান ইলাহী, নগর কর্মপরিষদ সদস্য আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ড. মাহবুবুর রহমান, আমির হোসাইন, অধ্যক্ষ মাওলানা জাকের হোসাইন, মাওলানা মমতাজুর রহমান, মাহমুদুল আলম, ফখরে জাহান সিরাজী সবুজ, অধ্যাপক মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ, ফারুকে আজম, অধ্যাপক মুহাম্মদ নুরুন্নবী, মুহাম্মদ ইসমাইল এবং ড. আ. ম. ম. মাসরুর হোসাইন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বৈঠকে বাকলিয়া থানা আমীর সুলতান আহমদ, বায়েজিদ থানা আমীর অধ্যাপক জাকের হোসাইন, চকবাজার থানা আমীর আহমেদ খালেদুল আনোয়ার, খুলশি থানা আমীর আলমগীর ভুঁইয়া, সদরঘাট থানা আমীর এম এ গফুর, পাহাড়তলী থানা আমীর নুরুল আলম, আকবরশাহ থানা আমীর আব্দুল হান্নান চৌধুরী, জামায়াত নেতা শাহজাহান মহিউদ্দিন, ইঞ্জি. রুহুল আমীন, সেলিমুজ্জামান এবং ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগরী উত্তর সভাপতি মুমিনুল হকসহ মহানগরীর বিভিন্ন স্তরের শীর্ষ দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে দুর্যোগ মোকাবেলায় স্ব-স্ব এলাকার কর্মপরিকল্পনা পেশ করেন।



Leave a Comment