মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
স্পোর্টস ডেস্ক: বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্বের এক রুদ্ধশ্বাস ও রোমাঞ্চকর মহারণ ম্যাচে ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে অবিশ্বাস্য এক রূপকথার গল্প লিখল ল্যাটিন আমেরিকার পরাশক্তি আর্জেন্টিনা।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও মাঠের লড়াইয়ে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে আফ্রিকান ঈগল মিশরকে ৩-২ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে আলবিসেলেস্তেরা। চলতি আসরে এই প্রথমবার প্রথমার্ধে পিছিয়ে থেকে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে।
ম্যাচের শুরুতে গোল হজম করা এবং দলের মহাতারকা লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিসের কারণে গোল শোধ দিতে না পারায় ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেই দ্বিতীয়ভাগ বা দ্বিতীয়আর্ধের খেলা শুরু করতে হয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে কাঁপিয়ে দিয়ে আক্রমণ শানাতে থাকে মিশর। ম্যাচের ঠিক ১৫ মিনিটের মাথায় মিশরীয় ডিফেন্ডার ইয়াসির ইব্রাহিম ডি-বক্সের মাঝখান থেকে দুর্দান্ত ও নিখুঁত এক হেডে বল আর্জেন্টিনার জালে জড়ান। কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে চমৎকার ক্রস বাড়িয়ে এই গোলটিতে অ্যাসিস্ট করেছিলেন মারওয়ান আতিয়া, যা পোস্টের ডানদিকের নিচের কোণ দিয়ে জালের ভেতরে চলে গেলে ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
১৫ মিনিটে গোল খাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিটের ব্যবধানেই পেনাল্টি থেকে গোল শোধ দেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। তাগলিয়াফিকো মিশরের ডি-বক্সের মধ্যে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। কিন্তু ম্যাচের ২১ মিনিটে অধিনায়ক লিওনেল মেসির নেওয়া বাম পায়ের স্পট কিকটি বাঁ দিকে অসাধারণ ডাইভ দিয়ে ফিরিয়ে দেন মিশরের অতন্দ্র প্রহরী ও গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। মেসি শটটি গোলরক্ষকের বাঁ দিক ঘেঁষে নিলেও তাতে পর্যাপ্ত গতি ছিল না, ফলে সঠিক উচ্চতায় থাকা বলটিকে দারুণভাবে প্রতিহত করেন মোস্তফা। এই মিসের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নেওয়া নিজের মোট ৮টি পেনাল্টির মধ্যে ৪টিই মিস করার এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড গড়লেন মেসি, যা চলতি বিশ্বকাপে তাঁর দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস। এর আগে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচেও তিনি পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অন্যদিকে, মিশরীয় গোলরক্ষক মোস্তফার জন্যও এটি এই টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় পেনাল্টি সেভ, কারণ এর আগে গ্রুপ পর্বে ইরানের স্ট্রাইকার তারেমির পেনাল্টিও তিনি একইভাবে আটকে দিয়েছিলেন। পেনাল্টি মিসের পর ২৮ মিনিটে আরেকবার আর্জেন্টিনাকে গোলবঞ্চিত করেন মোস্তফা; রদ্রিগো ডি পলের চমৎকার ক্রসে ম্যাক অ্যালিস্টারের নেওয়া জোরালো হেড ডানদিকে ঝুঁকে রুখে দেন তিনি। এর ১০ মিনিট পর মেসির একটি শট গোলবারের অনেক উপর দিয়ে চলে যায় এবং ঠিক পরের মিনিটেই তাগলিয়াফিকোর কাটব্যাক থেকে বল পেয়ে আলভারেজ শট নিলেও বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তা প্রতিহত করেন মোস্তফা।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে, তবে মিসরের রক্ষণভাগে ৯ জন খেলোয়াড় একদম জমাট বেঁধে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ম্যাচের একপর্যায়ে মেসি কিছুটা ফাঁকা জায়গা তৈরি করে রদ্রিগো ডি পলকে বল বাড়িয়ে দিলেও ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া ডি পলের নিচু শটটি মিসরীয় গোলরক্ষক সহজেই গ্লাভসবন্দী করেন। এর পরপরই এক মারাত্মক পাল্টা আক্রমণ (কাউন্টার অ্যাটাক) থেকে হাসানের বাড়ানো পাস ধরে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার মার্টিনেজকে পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন মিশরের জিকো। হাসানের চমৎকার দৌড়, মোহাম্মদ সালাহর পাস এবং জিকোর নিখুঁত ফিনিশিং মিলিয়ে এটি চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল হতে পারতো। তবে নাটকের তখনও বাকি ছিল; গোলটি হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে মাঠের অন্য প্রান্তে আর্জেন্টিনার এক খেলোয়াড় ফাউলের শিকার হওয়ায় ভিএআরের হস্তক্ষেপে গোলটি শেষ পর্যন্ত বাতিল করে সেখানে ফ্রি কিক দেওয়া হয়। গোল বাতিলের এই নাটকীয় ধাক্কা এবং মাঠের রেফারির সিদ্ধান্তের পর আর্জেন্টিনা দল যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। এরপরই শুরু হয় আলবিসেলেস্তেদের সেই ঐতিহাসিক ও অবিশ্বাস্য রূপকথার প্রত্যাবর্তন, যেখানে মিশরের জমাট রক্ষণভাগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে পর পর ৩টি গোল আদায় করে নেয় আর্জেন্টিনা। শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে ৩-২ গোলের এক অবিশ্বাস্য ও স্মরণীয় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে মেসি বাহিনী।