চকরিয়ায় পাহাড়ধসে ২ শিশুর মৃত্যু: কক্সবাজারে মাতামুহুরীর ঢলে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি

কক্সবাজার প্রতিনিধি: টানা কয়েক দিনের অবিরাম ও প্রলয়ঙ্কারী ভারী বর্ষণের জেরে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় এক ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় ঘুমন্ত অবস্থায় ২ শিশুর অত্যন্ত করুণ ও মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

গতকাল বুধবার (৮ জুলাই) দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী এলাকায় এই আকস্মিক ও লোহমর্ষক দুর্ঘটনাটি ঘটে। মধ্যরাতে পাহাড়ের বিশাল মাটির স্তূপ ধসে একটি বসতঘরের ওপর আছড়ে পড়লে মাটির নিচে চাপা পড়ে এই দুই তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যায়।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহিন দেলোয়ার ঘটনার সত্যতা পুরোপুরি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, নিহত অবুজ শিশুরা হলো—স্থানীয় বরইতলী এলাকার বাসিন্দা আবদুল মজিদের ছেলে তৌসিফ উদ্দিন (১৩) এবং একই এলাকার কাজলের কন্যা রুমি আক্তার (১৩)। মধ্যরাতের এই আকস্মিক ট্র্যাজেডির পর পুরো বরইতলী ইউনিয়নজুড়ে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে এবং নিহতদের পরিবারে চলছে মরণোত্তর মাতম। খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মাটির নিচ থেকে শিশু দুটির নিথর দেহ উদ্ধার করেন।

এদিকে গত এক সপ্তাহ ধরে চলা টানা নিরবচ্ছিন্ন অতিবৃষ্টির কারণে কক্সবাজার জেলার সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতির চরম ও আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটেছে। উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢল এবং মাতামুহুরী নদীর পানি উপচে চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার অন্তত ১৫ হাজার পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ইতিমধ্যে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় পুরো জেলায় সব মিলিয়ে লক্ষাধিক মানুষ গৃহবন্দি ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।

বন্যার পানি হু হু করে লোকালয়ে প্রবেশ করায় হাজার হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি, গ্রামীণ রাস্তাঘাট, মাছের ঘের এবং ফসলি জমি সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড ও জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এমন উদ্ভূত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পানিবন্দি ও পাহাড়ের পাদদেশে থাকা পরিবারগুলোকে অতি দ্রুত নিজেদের জানমাল রক্ষার্থে কাছাকাছি থাকা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার জন্য স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চকরিয়া ও পেকুয়ার বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় দফায় দফায় মাইকিং ও জরুরি সতর্কবার্তা জারি করা হচ্ছে।

ভয়াবহ এই বন্যা ও প্লাবনের পরিস্থিতি কেবল চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির থাবায় পুরো কক্সবাজার জেলা এখন লণ্ডভণ্ড। জেলার নবগঠিত ঈদগাঁও, রামু, টেকনাফ এবং উখিয়া উপজেলার অধিকাংশ নিচু এলাকা ও গ্রামীণ জনপদ বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়েছে। ফলে এসব অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ আকস্মিকভাবে তীব্র খাবার পানি ও খাদ্য সংকটে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। প্রধান প্রধান গ্রামীণ সড়কগুলো জলমগ্ন থাকায় উপজেলাগুলোর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যার ফলে দুর্গত এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাতে চরম বেগ পেতে হচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও জনপ্রতিনিধিরা বানভাসি ও পানিবন্দি মানুষদের জন্য দ্রুত শুকনো খাবার, সুপেয় পানি এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।



Leave a Comment