অন্তঃসত্ত্বার পেটে লাথি মেরে গর্ভপাতের ঘটনায় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা
নেত্রকোনা প্রতিনিধি: নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে নির্মমভাবে লাথি মেরে গর্ভপাত ঘটানোর গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর মামলায় প্রধান আসামি ও স্থানীয় বিএনপি নেতা ফেরদৌস মিয়ার (৪২) বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।
আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) জেলার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীন মোহনগঞ্জ আমলী আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সানজানা হক এই কঠোর আদেশ প্রদান করেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনি বাধ্যবাধকতা ও আদালতের সার্বিক বিষয়াদি নিশ্চিত করে আদালত পুলিশের জেনারেল রেজিস্ট্রার অফিসার (জিআরও) রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, মামলার প্রধান আসামি ফেরদৌস মিয়া মোহনগঞ্জ উপজেলার সুয়াইর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর এই অমানবিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখানোর ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে।
আলোচিত এই মামলার এজাহার ও লিখিত অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ভুক্তভোগী গৃহবধূ আশা আক্তার (২১) মোহনগঞ্জ উপজেলার সুয়াইর গ্রামের বাসিন্দা এবং তিনি ঘটনার সময় তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। গত ৩ জুন বাবার বাড়ি পালগাঁও গ্রামে অবস্থানকালে আশার ভাইয়ের একটি পোষা কুকুর প্রতিবেশী বিএনপি নেতা ফেরদৌস মিয়ার ছাগলের পাশে ঘোরাফেরা করাকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে প্রথমে তীব্র বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ফেরদৌস মিয়া ও তাঁর সশস্ত্র সহযোগীরা একজোট হয়ে আশার ভাই জুয়েল মিয়াকে বেদম মারধর শুরু করেন। ভাইয়ের ওপর এমন বর্বর আক্রমণ দেখে তাঁকে রক্ষা করতে তাৎক্ষণিকভাবে এগিয়ে গেলে আশার বৃদ্ধ বাবা দিলখোশ মিয়া এবং মা সালেমা আক্তারও প্রতিপক্ষের নৃশংস হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাবা-মা ও ভাইকে রক্ষার্থে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা আশা আক্তার যখন বাধা দিতে যান, তখন আসামিরা তাঁকে শারীরিকভাবে চরম লাঞ্ছিত করে এবং প্রধান আসামি ফেরদৌস মিয়া অত্যন্ত নির্মমভাবে তাঁর পেটে সজোরে লাথি মারেন। লাথির আঘাতে আশা আক্তার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর তীব্র রক্তক্ষরণ শুরু হলে স্বজনেরা তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিনই ওই গৃহবধূর পেটের সন্তানটি নষ্ট বা গর্ভপাত হয়ে যায়। এই পৈশাচিক ঘটনার পরদিন আশার বাবা দিলখোশ মিয়া মোহনগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে তোলপাড় করা সংবাদ প্রকাশিত হলে পুলিশ টনক নড়ে এবং ৫ জুন আশার স্বামী সালমান শাহ বাদী হয়ে থানায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ফেরদৌস মিয়াসহ মোট ছয়জনকে সুনির্দিষ্ট আসামি করা হয়।
মামলার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মোহনগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জয় পাল মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানান, এজাহারনামীয় ছয় আসামির মধ্যে বৃহস্পতিবার সকালে পাঁচজন আসামি মোহনগঞ্জ আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করেন। আদালত মামলার নথিপত্র ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে ওই পাঁচ আসামির অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করলেও প্রধান আসামি বিএনপি নেতা ফেরদৌস মিয়া আদালতে উপস্থিত না হয়ে পলাতক থাকেন। প্রধান আসামির এমন আদালত অবমাননা ও গুরুতর অপরাধের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ বিচারক তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে অবিলম্বে তাঁকে গ্রেফতারের জন্য পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন। পলাতক আসামি ফেরদৌস মিয়াকে যেকোনো মুহূর্তে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান এই তদন্ত কর্মকর্তা।