চট্টগ্রামে টানা ৫ দিনের অতিবৃষ্টিতে ভয়াবহ বন্যা: জেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল
,
চট্টগ্রাম ব্যুরো: টানা পাঁচ দিনের অভূতপূর্ব ও রেকর্ডভাঙা ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলে অবর্ণনীয় ও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সিংহভাগ উপজেলা। জেলাজুড়ে সৃষ্ট এই আকস্মিক বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ অত্যন্ত সফল ও দ্রুততার সাথে মোকাবেলা করতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি জরুরি ভিত্তিতে বাতিল করা হয়েছে।
দুর্গত এলাকার সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি সার্বক্ষণিক বা ২৪ ঘণ্টার বিশেষ কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম বা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান, সরকারি ত্রাণ বিতরণ ও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এই কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। মতবিনিময়কালে জেলা প্রশাসক অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এই চরম মহাদুর্যোগের সময়ে অবরুদ্ধ মানুষের অমূল্য জীবন রক্ষাই বর্তমান জেলা প্রশাসনের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও প্রধানতম কর্তব্য।
সামান্যতম অসচেতনতার কারণেও যেন কোনো সাধারণ মানুষের প্রাণ অকালে ঝরে না পড়ে, সেই লক্ষ্যে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢাল ও প্লাবিত জনপদে বসবাসকারী সবাইকে অবিলম্বে ঘরবাড়ি ছেড়ে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান। চট্টগ্রামের এই আশঙ্কাজনক বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিতভাবে ঢাকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে সার্বক্ষণিক অবহিত করা হচ্ছে এবং সেখান থেকে প্রতি ঘণ্টায় পরিস্থিতির সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ত্রাণ তৎপরতার বিষয়ে সাংবাদিকদের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে জেলা প্রশাসক জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে দুর্গতদের জন্য ২০০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১০ লাখ টাকা জরুরি ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ তহবিল থেকেও অতিরিক্ত আরও ২০ লাখ টাকার আর্থিক অনুদান পাওয়া গেছে। প্রথম দফার এই বিশেষ বরাদ্দ ইতিমধ্যে বন্যা উপদ্রুত বিভিন্ন উপজেলায় সফলভাবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) চাহিদার ভিত্তিতে নতুন বরাদ্দও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বিতরণ করা হবে, যাতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কোনো মানুষ বিন্দুমাত্র খাদ্যসংকটে না পড়েন।
তবে জেলার সাতকানিয়া ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার ও গতিশীল করতে এই মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে অন্তত ১০টি অত্যাধুনিক স্পিডবোট প্রয়োজন বলে বিশেষ তাগিদ দেন জেলা প্রশাসক। এ বিষয়ে ঢাকার সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে ইতিমধ্যে অফিশিয়াল চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং স্পিডবোট পাওয়া গেলে পানিবন্দী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে উদ্ধারকাজ আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে। তবে স্পিডবোট আসার আগ পর্যন্ত স্থানীয় নৌকার মাধ্যমেই উদ্ধার অভিযান পুরোদমে চালানো হচ্ছে।
দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন, সরকারের বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট দপ্তর, রেড ক্রিসেন্ট, ইফসা, আনসার বাহিনী, ক্ষিপ্রগতির স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে (এনজিও) যুক্ত করে পৃথক পৃথক বিশেষ উদ্ধারকারী দল গঠন করা হয়েছে, যারা যেকোনো দুর্গত এলাকায় খবর পাওয়া মাত্রই তৎক্ষণাৎ পৌঁছে উদ্ধার ও জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
পাহাড়ধসের মতো মারাত্মক ও লোহমর্ষক দুর্ঘটনা রোধে এবং সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঠেকাতে জেলা প্রশাসক নিজেও দিনরাত মাঠে সক্রিয় রয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, মহানগরের লালখান বাজার, পোড়া পাহাড় ও ১ নম্বর ঝিলসহ বিভিন্ন চরম ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী বস্তিগুলো তিনি নিজে সশরীরে পরিদর্শন করেছেন। সেসব ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারী মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জোর আহ্বান জানানোর পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের মাঝে শুকনো খাবার ও গরম রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
বর্তমানে জেলাজুড়ে মোট ৬২৯টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং সেখানে ইতিমধ্যে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের জন্য চিড়া, মুড়ি, গুড়, শিশুদের পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে মাফিন, কেক, বিস্কুট, জীবন রক্ষাকারী ওরস্যালাইন এবং পরিবার প্রতি পাঁচ লিটার করে বোতলজাত বিশুদ্ধ সুপেয় পানি নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অত্যন্ত সংবেদনশীল গর্ভবতী নারী, দুগ্ধজাত শিশু ও প্রবীণ বা বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসকের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক আরও জানান, জেলার সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলায় প্রায় আট হাজার বানভাসি মানুষ ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ইতোমধ্যে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বন্যাদুর্গত কোনো মানুষ যেন একটি বেলার জন্যও অভুক্ত না থাকেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে কোনোভাবেই বঞ্চিত না হন।
প্রশাসনিক ও সমাজতাত্ত্বিক দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরে জাহিদুল ইসলাম মিঞা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দুর্যোগ মোকাবেলা করা শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়; এটি আসলে পুরো সমাজের সর্বস্তরের মানুষের একটি সম্মিলিত ও মানবিক দায়িত্ব। তিনি সমাজের বিত্তবান, শিল্পমালিক ও সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি সামর্থ্য অনুযায়ী দুর্গত ও বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিশেষ আহ্বান জানিয়ে বলেন, একটি কল্যাণমুখী ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে এই দুর্যোগকবলিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও পরীক্ষা।
সবশেষে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা ও প্লাবিত নিচু জনপদের বাসিন্দাদের প্রতি পুনরায় দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার চূড়ান্ত অনুরোধ জানিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মানুষের জীবনের সুরক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনে আগামীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর সহায়তায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে জোরপূর্বক নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে, কারণ মানুষের একেকটি তাজা জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই হতে পারে না।