লামায় পাহাড়ধসে শিশুসহ ৫ জন নিহত

July 9, 2026 | Feature-2 |

বান্দরবান প্রতিনিধি: পার্বত্য জেলা বান্দরবানের লামা উপজেলায় গত কয়েক দিনের অবিরাম ও রেকর্ডভাঙা অতিবৃষ্টির জেরে এক প্রলয়ঙ্কারী ও হৃদয়বিদারক প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নে পৃথক দুটি স্থানে বসতঘরের ওপর পাহাড়ের বিশাল মাটির স্তূপ ধসে পড়ার ঘটনায় এক শিশু এবং দুই দম্পতিসহ দুই পরিবারের মোট ৫ জন সদস্যের অত্যন্ত করুণ ও মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে, যখন সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, তখন এই ভয়াবহ ধসের দুর্ঘটনাটি ঘটে। লোহমর্ষক এই ঘটনায় নিহত ভাগ্যবঞ্চিতরা হলেন—আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. ইউনুস (২৮), তাঁর স্ত্রী রানু আক্তার (২২), তাঁদের ৪ বছর বয়সী অবুজ শিশুসন্তান মো. সোলেমান এবং একই এলাকার বাসিন্দা মো. জুয়েল (৩৪) ও তাঁর স্ত্রী কুলছুমা আক্তার (২৫)।

ঘটনার পর পরই পুরো আজিজনগর এলাকায় চরম শোকের ছায়া ও কান্নার রোল নেমে আসে। খবর পাওয়া মাত্রই স্থানীয় বাসিন্দা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী দল এবং পুলিশ সদস্যরা তুমুল বৃষ্টির মাঝেই দুর্গম পাহাড়ি কাদা মাড়িয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন এবং একে একে ৫ জনের নিথর মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সূত্র থেকে জানা গেছে, গত রবিবার থেকে শুরু হওয়া টানা নিরবচ্ছিন্ন মৌসুমী ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ের ভেতরের মাটি নরম ও আলগা হয়ে বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় ধসের সৃষ্টি হচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ভোরে আজিজনগর ইউনিয়নের পাগলাছড়া এলাকায় একটি পাহাড় ধসে নিচে থাকা ঘরের ওপর আছড়ে পড়লে মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের ৩ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। প্রায় একই সময়ে ওই এলাকার আরেকটি পাহাড়ধসে পাশের একটি বসতঘর লণ্ডভণ্ড হয়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে আরও এক দম্পতির অকালমৃত্যু ঘটে।

ঘটনার সত্যতা পুরোপুরি নিশ্চিত করে বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পাহাড়ধসের খবর পেয়েই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কাজে হাত বাড়ায় এবং ৫ জনের লাশ উদ্ধার করে। পাহাড়ের এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে লামাসহ বান্দরবানের বিভিন্ন উপজাতীয় ও বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি এখন সর্বোচ্চ রূপ ধারণ করেছে। নতুন নতুন পাহাড়ি এলাকা ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় স্থানীয় জনজীবন ও আন্তঃউপজেলা সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে দুর্গতদের জন্য ২২০টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং অনেক পানিবন্দী মানুষ সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, মৃত্যুর মুখ খাড়া থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী অনেক বাসিন্দা এখনও তাঁদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে চরম অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন, যা প্রশাসনকে ভাবিয়ে তুলছে। বর্তমানে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে বান্দরবানের প্রধান দুই নদী সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

একই সঙ্গে টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে এবং গাছ উপড়ে পড়ার কারণে বিভিন্ন উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ, সরকারি বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে উদ্ধারকারীদের বেগ পেতে হচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রশাসন ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জানমালের সুরক্ষায় প্রয়োজনে জোরপূর্বক নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন।



Leave a Comment