টাইফুন ‘মায়সাক’-এর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড চীন: বাঁধ ভেঙে ও ভূমিধসে শিশুসহ নিহত ৩৮
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট অতি শক্তিশালী ও প্রলয়ঙ্কারী সুপার টাইফুন ‘মায়সাক’-এর প্রভাবে চীনের বিভিন্ন প্রদেশে টানা রেকর্ডভাঙা ভারী বৃষ্টি, স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা ও একের পর এক পাহাড়ি ভূমিধসের ঘটনায় অন্তত ৩৮ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে চীনের একাধিক অঞ্চলের একটি বিশাল প্রধান জলাধারের কংক্রিটের শক্তিশালী বাঁধ ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হয়েছে, উপচে পড়েছে কয়েক ডজন প্রধান নদী এবং প্রাণ বাঁচাতে হাজার হাজার মানুষকে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছে।
চীনের সরকারি তথ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংসি অঞ্চলে টাইফুনের প্রভাবে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় অন্তত ছয়জনের সলিলসমাধি ঘটেছে। এই অঞ্চল থেকে ইতিমধ্যে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার বানভাসি মানুষকে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো আরও জানিয়েছে, শুধুমাত্র গুয়াংসিতেই অন্তত ৪০টি নদী ও জলপথের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে বিস্তীর্ণ এলাকা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, যার ফলে কৃষকদের প্রায় ১৩ হাজার একর ফসলি জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভির (CCTV) প্রচারিত লোহমর্ষক ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, একটি বিশাল জলাধারের কংক্রিটের বাঁধ ভেঙে প্রবল স্রোতে ঘোলা পানি লোকালয়ের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে এবং উদ্ধারকর্মীরা লাইফ জ্যাকেট পরে রাবারের স্পিডবোটে করে দুর্গত ও ঘরের চালে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন।
ভয়াবহ এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত দুর্গত এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত ত্রাণসামগ্রী, শুকনো খাদ্য, ওয়াটারপ্রুফ রেইনকোট ও পর্যাপ্ত রাবারের নৌকা পাঠানো হয়েছে। চীনের কেন্দ্রীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে গুয়াংসি প্রদেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রার রেড অ্যালার্ট বা জরুরি সতর্কতা জারি রেখেছে।
দেশটির পানি সম্পদমন্ত্রী লি গোইং এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, উঝৌ প্রধান জলপরিমাপ কেন্দ্রে নদীর পানি যেকোনো সময় স্বাভাবিক বিপৎসীমার অন্তত ছয় মিটারেরও বেশি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। ফলে টানা বৃষ্টি ও উচ্চমাত্রার পানির এই তীব্র প্রবাহের কারণে ওই অঞ্চলের অন্যান্য বড় বড় প্রাচীন জলাধার ও বাঁধগুলোর ধারণক্ষমতা এখন এক বড় ধরনের পরীক্ষা ও চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে।
এদিকে চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশে টাইফুনের প্রভাবে সৃষ্ট আকস্মিক তীব্র বজ্রঝড় ও ঘণ্টায় রেকর্ড গতির ঝড়ো বাতাসে আরও ১১ জন নিহত এবং ৩৩১ জন সাধারণ নাগরিক গুরুতর আহত হয়েছেন এবং একজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। ঝড়ের তীব্রতায় প্রদেশটিতে প্রায় ৪ হাজার ৮০০টি ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২২টি বহুতল ভবন সম্পূর্ণ ধসে মাটির সাথে মিশে গেছে।
অন্যদিকে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দুর্গম গানসু প্রদেশে ভারি বর্ষণজনিত কারণে ঘটা ভয়াবহ ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ২১ জনে দাঁড়িয়েছে। জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সকালে গানসু প্রদেশের দাংচাং কাউন্টির অন্তর্গত রেনচাং গ্রামে পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়লে নিচে থাকা বসতবাড়ির অন্তত ৩৩ জন বাসিন্দা জীবন্ত মাটিচাপা পড়েন।
সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের কয়েক দিনের টানা উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত হওয়ার পর স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ আজ ২১ জনের লাশ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পাহাড়ের এই আকস্মিক ও রহস্যময় ধসের প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার দ্রুত পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৩ কোটি ইউয়ান (চীনা মুদ্রা) জরুরি তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
দেশের এমন ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দেশের সকল সামরিক ও বেসামরিক উদ্ধারকারী বাহিনীকে তাদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা ও আধুনিক প্রযুক্তি খাটিয়ে নিখোঁজদের উদ্ধার এবং উপদ্রুত এলাকায় দ্রুততম সময়ে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কঠোর ও বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন।