নিজ জন্মভূমিতে চিরনিদ্রায় শায়িত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি: লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায়
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও ধর্মীয় নানান আনুষ্ঠানিকতা শেষে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পূর্ণ সম্পন্ন হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তাঁর স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র জন্মভূমি এবং শিয়া মুসলিমদের অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক নগরী মাশহাদের ঐতিহাসিক ইমাম রেজা (আ.) মাজার প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সর্বোচ্চ নেতার এই বিদায় ও দাফন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আজ দুপুর থেকেই মাশহাদের প্রধান প্রধান রাজপথ ও সংযোগ সড়কগুলোতে লাখ লাখ শোকাহত মানুষের উপচে পড়া ঢল নামে। কালো পোশাক পরিহিত ও অশ্রুসিক্ত নয়নে লাখো জনতার উপস্থিতিতে সুসজ্জিত একটি বিশেষ ট্রাকে করে আয়াতুল্লাহ খামেনির মরদেহ রাজপথ দিয়ে বহন করা হয় এবং ধীরলয়ে সেটি বিশ্বখ্যাত ইমাম রেজা (আ.) মাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক সর্বোচ্চ সম্মানের সাথে এই প্রভাবশালী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতার দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়, যা সমকালীন মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক বড় অধ্যায়ের অবসান ঘটালো।
এর আগে গত শুক্রবার (৩ জুলাই) থেকে সর্বোচ্চ নেতার স্মরণে ইরানজুড়ে সাত দিনের সরকারি বা রাষ্ট্রীয় শোক পালন শুরু করে তেহরান প্রশাসন। তবে দেশটিতে চলমান এই গভীর শোকের আবহের মধ্যেও পারস্য উপসাগর ও পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের যুদ্ধংদেহী সামরিক উত্তেজনা বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং তা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত মঙ্গলবার (৭ VII) মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী আকস্মিকভাবে ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় একযোগে ব্যাপক ও বিধ্বংসী বিমান হামলা চালায়। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে মার্কিন সামরিক কমান্ড দাবি করেছে, গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের ক্রমাগত হামলার মোক্ষম জবাব দিতেই তারা এই বিশেষ বিমান অভিযান পরিচালনা করেছে। তবে মার্কিন এই সর্বাত্মক আগ্রাসনের মুখে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি তেহরান।
আমেরিকার এই হামলার তীব্র ও কড়া জবাব দিতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বাহরাইন এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অত্যন্ত সুরক্ষিত সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিতে ঝাঁকে ঝাঁকে আত্মঘাতী ড্রোন ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের শক্তিশালী এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। পরাশক্তি আমেরিকা এবং আঞ্চলিক শক্তি ইরানের এই সরাসরি মুখোমুখি ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে।
পারস্য উপসাগরের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও আয়াতুল্লাহ খামেনির শেষ বিদায়ের ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানসমূহ পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অব্যাহত রাখে ইরান সরকার।
ইরানের পবিত্র শহর কোমে প্রথম দফার বিশাল শোকযাত্রা শেষে তাঁর মরদেহ বিশেষ বিমানে করে প্রতিবেশী দেশ ইরাকের পবিত্র নাজাফ শহরে নেওয়া হয়। সেখানে অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, খামেনির জ্যেষ্ঠ পুত্র মোস্তাফা হোসেইনি খামেনি এবং ইরাকের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতারা সশরীরে উপস্থিত হয়ে প্রয়াত এই সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
নাজাফের আনুষ্ঠানিকতা শেষে খামেনির মরদেহ কারবালা শহরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে শিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম পবিত্র স্থান ইমাম হোসেন (আ.) ও আল-আব্বাস (আ.)-এর ঐতিহাসিক মাজারে পৃথক দুটি সুবিশাল শোকযাত্রা ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। ইরাকের সকল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর মরদেহ পুনরায় ইরানে ফিরিয়ে এনে সরাসরি মাশহাদে সমাহিত করা হয়।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আকস্মিক এক যৌথ বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন বলে তেহরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল এবং সেই ঐতিহাসিক হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই সমগ্র ইরানে এক দীর্ঘস্থায়ী শোক ও ক্ষোভের আবহ বিরাজ করছে।