বৈষম্যহীনতার রক্তিম সূচিপত্র: ১৬ জুলাই ও ‘জুলাই শহীদ দিবস’

July 16, 2026 | Feature-2 |

বিশেষ প্রতিবেদন: একটি স্লোগান কিংবা একটি বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড কীভাবে পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে শানিত করে বিশ্ব কাঁপানো গণঅভ্যুত্থানে রূপ দিতে পারে, তার দৃষ্টান্ত মানবসভ্যতায় রয়েছে বহু। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানটি তেমনই এক ফুলকি হিসেবে কাজ করেছিল। আর সেই ফুলকিকে দাবানলে রূপ দেয় দু’হাত প্রসারিত করে রাষ্ট্রীয় বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের মহিমান্বিত আত্মদান। চব্বিশের ১৬ জুলাই এক দিনে আবু সাঈদ ও ওয়াসিমসহ ছয় শহীদের রক্তস্নাত আত্মাহুতি কোটাবিরোধ আন্দোলনকে রূপ দেয় স্বৈরাচার হটানোর এক অভূতপূর্ব বিপ্লবে। ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় সেই দিনটির স্মরণে দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে আজ পালিত হচ্ছে ‘জুলাই শহীদ দিবস’।

বৈশ্বিক গণঅভ্যুত্থানের আয়নায় চব্বিশের জুলাই
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জনগণের ভেতর দীর্ঘদিনের চেপে রাখা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটাতে সবসময় একটি সুনির্দিষ্ট স্ফুলিঙ্গের প্রয়োজন হয়। ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিউনিসিয়ার সিদি বাউজিদ শহরে ২৬ বছর বয়সী ফল বিক্রেতা মোহামেদ বুয়াজিজির ঠেলাগাড়ি পুলিশ কেড়ে নিলে ক্ষোভে-অপমানে তিনি নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মাহুতি দেন। এই একটি ঘটনাই তিউনিসিয়ার মানুষের দীর্ঘদিনের বেকারত্ব ও দুর্নীতির ক্ষোভকে রাস্তায় নামিয়ে আনে, যার জেরে ২৩ বছরের স্বৈরশাসক বেন আলি পালাতে বাধ্য হন এবং জন্ম নেয় ‘আরব বসন্ত’।

অনুরূপভাবে, ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েটো শহরে কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের ওপর আফ্রিকান্স ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে বের হওয়া মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে ১২ বছরের হেক্টর পিটারসনসহ বহু শিক্ষার্থী নিহত হয়। হেক্টরের রক্তাক্ত লাশ কোলে নিয়ে এক যুবকের দৌড়ানোর ছবি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লে তা নেলসন ম্যান্ডেলার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দেয়। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনের গতি-প্রকৃতির সঙ্গে এই বৈশ্বিক বিপ্লবগুলোর দারুণ মিল রয়েছে। জনগণের ক্ষোভ আর দমনের বারুদে জাস্ট একটা স্ফুলিঙ্গ দরকার ছিল, যা বাংলাদেশে এনে দিয়েছিল আবু সাঈদ বা ওয়াসিমদের রক্ত।

ইতিহাসের তিন মহিমান্বিত আত্মত্যাগ ও গণবিস্ফোরণ
দক্ষিণ আফ্রিকা
(১৬ জুন, ১৯৭৬)
তিউনিসিয়া
(১৭ ডিসেম্বর, ২০১০)
বাংলাদেশ
(১৬ জুলাই, ২০২৪)
হেক্টর পিটারসনের রক্তাক্ত মরদেহ কোলে যুবকের দৌড়; বর্ণবাদের পতন। মোহামেদ বুয়াজিজির আত্মাহুতি; যা জন্ম দেয় ঐতিহাসিক ‘আরব বসন্ত’ এর স্বৈরাচার পতন। আবু সাঈদের দু’হাত প্রসারিত আত্মদান; ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অবসান।

রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রথম ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালন
অবিস্মরণীয় এই দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে ১৬ জুলাইকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে পালনের নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার দিনটি পালনে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখাসহ ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গভীর বাণী দিয়েছেন। এছাড়া গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ৫ আগস্টকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ ঘোষণা করে সাধারণ ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে।

যেভাবে বীরত্ব ও অমরত্বের প্রতীক হলেন আবু সাঈদ
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ ছিলেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক। ১৬ জুলাই দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের সামনে একদল আগ্রাসী পুলিশ তাকে ঘিরে ধরে ছররা গুলি করতে থাকে। মাত্র ৩৫-৩৮ ফুট দূর থেকে সরাসরি বুক লক্ষ্য করে চালানো গুলির সামনে দু’হাত প্রসারিত করে অকুতোভয় দাঁড়িয়ে বিশ্ববাসীকে তারুণ্যের দুরন্ত সাহস দেখান সাঈদ। ওএইচসিএইচআর-এর আন্তর্জাতিক ফরেনসিক প্রতিবেদনেও প্রমাণিত হয়েছে যে, তাকে প্রাণঘাতী ধাতব গুলিভর্তি শর্টগান দিয়ে অন্তত দুবার সুনির্দিষ্টভাবে গুলি করা হয়েছিল। হাসপাতালে নেওয়ার পর বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর পরও তার মরদেহ নিয়ে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার ছিনিমিনি খেলার অপচেষ্টা করলেও জীবিত সাঈদের চেয়ে মৃত সাঈদ কোটি তরুণের বুকে বিপুল শক্তি হয়ে জেনারেট হন, যা ৫ আগস্ট খুনি হাসিনার পতন ও পলায়ন নিশ্চিত করে। গত ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই হত্যাকাণ্ডের রায়ে সাবেক দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবনসহ ৩০ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেছে।

রক্তক্ষয়ী ১৬ জুলাই: রাজধানী থেকে বন্দরনগরী
১৬ জুলাই শুধু রংপুর নয়, রাজধানী ঢাকাসহ পুরো দেশ অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল। ঢাকার সায়েন্স ল্যাবে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের তাণ্ডবে মো. সবুজ আলী ও শাহজাহান নামে দুই তরুণ শহীদ হন। একই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের সাধারণ ছাত্রীরা হল থেকে ছাত্রলীগ নেত্রীদের বিতাড়িত করে ক্যাম্পাসকে ছাত্ররাজনীতিমুক্ত ঘোষণা করার ঐতিহাসিক ধারা শুরু করেন।

এদিকে চট্টগ্রামের মুরাদপুরে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডারদের এলোপাতাড়ি গুলি ও ছুরিকাঘাতে তিনজন শহীদ হন। তারা হলেন—চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম, ওমর গণি এমইএস কলেজের ছাত্র ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং পথচারী ফার্নিচার মিস্ত্রি মো. ফারুক। ওয়াসিম হত্যাকাণ্ডের পর পুরো বন্দরনগরীতে আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

স্মৃতির আয়নায় বৈষম্য: আলো আঁধারিতে অন্য শহীদরা
বিপ্লবের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ পরিবারগুলোর মনে জমেছে এক বুক অভিমান। ব্যানার, ফেস্টুন, রাষ্ট্রীয় আলোচনা কিংবা কোনো স্থাপনার নামকরণে শহীদ আবু সাঈদ ও শহীদ ওয়াসিমের নাম যেভাবে অগ্রাধিকার পাচ্ছে, সেভাবে উচ্চারিত হচ্ছে না ফয়সাল আহমেদ শান্ত, দিনমজুর মো. ফারুক, কিশোর মো. সায়মন, তানভীর সিদ্দিকী কিংবা হৃদয় চন্দ্র তরুয়াদের নাম। একই আন্দোলনে একই দাবিতে প্রাণ দেওয়া শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় এই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্পটলাইটের দূরত্বকে ‘স্মৃতির বৈষম্য’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্বজনেরা।

আর্থিক টানাপোড়েন ও পুনর্বাসনের দিক থেকেও ভালো নেই শহীদ শান্ত ও ফারুকের পরিবার। শান্তর বেকার বাবা ও স্কুলশিক্ষিকা মায়ের সংসার এখন দ্রব্যমূল্যের বাজারে হাঁপিয়ে উঠেছে; বারবার জেলা প্রশাসকের দ্বারে ঘুরেও একটা বিনা ভাড়ার বাসস্থান মেলেনি। অন্যদিকে শহীদ ফারুকের স্ত্রী দুই সন্তান নিয়ে কাটচ্ছেন চরম কষ্টে; পুলিশ হাসপাতালে অস্থায়ী আয়ার চাকরি মিললেও তা স্থায়ী হয়নি আজও। যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে বুক পেতে সন্তানরা লাশ হলো, সেই স্মৃতিরক্ষায় ও পুনর্বাসনে বৈষম্য যেন কোনোভাবেই এই মহৎ বিপ্লবকে কালিমালিপ্ত না করে—আজকের দিনে এটাই জুলাইবিপ্লবের প্রকৃত অংশীজনদের মূল দাবি।



Leave a Comment