শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞ: শেখ হাসিনা ও আজিজ আহমেদসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা
স্টাফ রিপোর্টার: ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশে নৈশকালীন সামরিক-বেসামরিক যৌথ অভিযান ও গণ-হত্যাযজ্ঞের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছে জমা দিয়েছে তদন্ত সংস্থা। এই প্রতিবেদনে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদসহ দেশের প্রভাবশালী ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
আজ রবিবার (১৯ জুলাই) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এই তদন্ত প্রতিবেদনটি চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে।
আসামির তালিকায় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা
তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, ৪১ জন আসামির তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন সেনাপ্রধান ছাড়াও তৎকালীন সরকারের বেশ কয়েকজন নীতি-নির্ধারক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়েছেন। আসামির তালিকায় আরও রয়েছেন—একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু, সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা, লেখক ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার কবীর।
এছাড়া ঘটনার সময়কার বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনারসহ অপারেশনের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে এই প্রতিবেদনে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
২১ জুলাই ট্রাইব্যুনালে দাখিল, ঢাকায় ৩২ জন নিহতের প্রাথমিক তথ্য
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর এডভোকেট আমিনুল ইসলাম জানান, তদন্ত সংস্থা আজ সকালে তাদের কাছে প্রতিবেদনটি হস্তান্তর করেছে। এটি বর্তমানে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আগামী ২১ জুলাই নির্ধারিত কার্যদিবসেই তদন্ত প্রতিবেদনটি ট্রাইব্যুনালের বিচারিক আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা হবে। পরবর্তীতে মামলার সামগ্রিক তদন্ত ও অগ্রগতির বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে আনুষ্ঠানিক সংবাদ ব্রিফিং করা হবে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান, তদন্তে এখন পর্যন্ত শুধু ঢাকা মহানগরী এলাকাতেই ৩২ জন নিহত হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে মাঠপর্যায়ে তদন্ত এখনও চলমান থাকায় এবং এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াধীন থাকায়, প্রকৃত নিহতের চূড়ান্ত সংখ্যা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। দেশজুড়ে এর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
ট্রাইব্যুনালে মধুপুরের পীর ও মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বে হেফাজত প্রতিনিধি দল
এদিকে শাপলা চত্বরের গণহত্যার মামলার তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি ও আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে আজ রবিবার সকালেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে যান হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল।
সংগঠনের সিনিয়র নায়েবে আমির আল্লামা আব্দুল হামিদ (মধুপুরের পীর সাহেব)-এর নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫ সদস্যের এই প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন—হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিসসহ অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম ও নেতৃবৃন্দ। তারা প্রসিকিউশন টিমের সাথে মামলার নথিপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ মতবিনিময় করেন।
ফিরে দেখা: ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বর ট্র্যাজেডি
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৫ মে নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষীদের শাস্তি এবং ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নসহ ঐতিহাসিক ১৩ দফা দাবিতে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে স্মরণকালের বৃহত্তম শান্তিপূর্ণ অবরোধ ও সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। দিনভর ঢাকা ও তার প্রবেশমুখগুলোতে সরকারের পেটুয়া বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষের পর গভীর রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
অন্ধকারের মধ্যে পুলিশ, র্যাব ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী ‘অপারেশন সিকিউরড ঢাকা’ নামে এক যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। ওই অভিযানে নির্বিচারে গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ব্যবহার করে চত্বর থেকে সমবেত লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই রাতের অভিযানে বহু মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা ও লাশ গুম করার অভিযোগ ওঠে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে, যা বর্তমানে বৈশ্বিক মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্তাধীন রয়েছে।