জোর করে নেওয়া শিক্ষকের পদত্যাগপত্রের আইনি বৈধতা নেই: হাইকোর্ট
নিউজ ডেস্ক: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছ থেকে জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের কোনো আইনি বৈধতা বা কার্যকারিতা নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে বলপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য হওয়া শিক্ষককে অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
উচ্চ আদালতের বিচার বিভাগীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নে অবহেলা বা অমান্য করা হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ (ম্যানেজিং কমিটি) ভেঙে দেওয়া, পর্ষদের সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধের মতো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে রায়ে।
মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র মামলায় বিচারপতি মো. ইকবাল কবির এবং বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল নিষ্পত্তি করে সম্প্রতি এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন। মূল রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. ইকবাল কবির।
মামলার পটভূমি ও আইনি লড়াই
ঘটনার সূত্রপাত: গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ‘গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়’-এর প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল দুষ্কৃতকারী জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়।
প্রশাসনিক আবেদন ও আইনি পদক্ষেপ: ঘটনার পর দিন তিনি স্থানীয় কালিয়াকৈর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে অবহিত করেন।
শিক্ষা বোর্ডের আদেশ ও রিট: শিক্ষা বোর্ডের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁকে স্বপদে বহালের নির্দেশ দেওয়া হলেও ম্যানেজিং কমিটি তা বাস্তবায়নে টালবাহানা করে। এই প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন আলকাছ উদ্দিন আহমেদ। রিটকারীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী মো. জহুরুল ইসলাম মুকুল ও মানবেন্দ্র রায় এবং পরিচালনা পর্ষদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস এম রেজাউল ইসলাম।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও কঠোর নির্দেশনা
জোরপূর্বক স্বাক্ষরের অকার্যকারিতা: রিটকারীর পদত্যাগপত্র কোনোভাবেই স্বেচ্ছায় প্রদত্ত ছিল না। আইনের দৃষ্টিতে চাপের মুখে সংগৃহীত স্বাক্ষরযুক্ত কাগজের কোনো ভিত্তি বা আইনি বৈধতা নেই। রিটকারী শিক্ষক ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত তাঁর এমপিও অংশ (বেতন-ভাতা) পাচ্ছিলেন, ফলে ম্যানেজিং কমিটি তাঁকে পদে বহাল রাখতে আইনগতভাবে বাধ্য।
শিক্ষা বোর্ডের আদেশের বাধ্যতামূলক প্রয়োগ: মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ডের এখতিয়ার রয়েছে ম্যানেজিং কমিটির প্রস্তাবিত শৃঙ্খলামূলক পদক্ষেপ স্থগিত বা বাতিল করার। বোর্ডের জারি করা নির্দেশাবলি মানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা। তা না মানা ক্ষমতার অপব্যবহার, অসদাচরণ এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সুপারিশ: রায়ে মাউশি ডিজি ও শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, আদালত ও বোর্ডের আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব বা অমান্য করা হলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি তাৎক্ষণিক বাতিল, সভাপতিকে বরখাস্ত এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের (যিনি কমিটির সদস্য-সচিব) এমপিও স্থগিত বা বন্ধের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।