যুক্তরাষ্ট্রে রক্তস্নাত হ্যালোইন উৎসব: অঙ্গরাজ্যে গুলিবর্ষণে নিহত ২৪, আহত ৯৪
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ঐতিহ্যবাহী ‘হ্যালোইন উৎসব’ কেন্দ্রিক উদ্যাপন রক্তস্নাত সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ডেলাওয়্যার পর্যন্ত দেশটির একাধিক অঙ্গরাজ্যে একের পর এক ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। নাইট ক্লাব, পোশাকের দোকান, স্টেডিয়াম ও একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আশপাশে চালানো এসব হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত এবং ৯৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত শনিবার (৩১ অক্টোবর ২০২৬) রাতে উৎসবের ভিড় থেকে শুরু হওয়া এই সহিংসতার ধারাবাহিকতা পরদিন রোববার (১ নভেম্বর) সকাল পর্যন্ত গড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠা মানুষের ভিড়, অতিরিক্ত মদ্যপান, মাদকের ব্যবহার এবং দেশটিতে আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতাই পরিস্থিতিকে এমন ভয়াবহ ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বছরের অন্যতম বিপজ্জনক দিন ‘হ্যালোইন’
নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির খ্যাতনামা অপরাধবিজ্ঞানী জেমস অ্যালান ফক্স এফবিআইয়ের অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানান, যুক্তরাষ্ট্রে বছরজুড়ে সবচেয়ে বেশি সহিংস ঘটনা ঘটার তালিকায় ৪ জুলাই (স্বাধীনতা দিবস) ও ১ জানুয়ারির (নতুন বছর) পরেই তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ৩১ অক্টোবর। অপ্রাপ্তবয়স্করা রাতে বাইরে বের হয়ে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করায় এই দিনে শিশু-কিশোররা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।
বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মর্মান্তিক হামলার চিত্র
ডেট্রয়েট: হ্যালোইন উৎসব শেষে ঘরে ফিরে নিজের ঘরে খেলার সময় ৫ বছর বয়সি এক শিশু হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হয়। ডেট্রয়েট পুলিশের উপপ্রধান আর্নল্ড উইলিয়ামস জানান, শিশুটি তার মাকে বলে, ‘আমার মনে হয়, আমাকে গুলি করা হয়েছে।’ ভাগ্যক্রমে শিশুটি বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত।
ফ্লোরিডা: ফ্লোরিডার সামরিক ও বিনোদন শহর জ্যাকসনভিলে দুটি পৃথক বন্দুক হামলায় ১৩ জন গুলিবিদ্ধ হন, যাদের মধ্যে ২ জন প্রাণ হারান। ১ নভেম্বর গভীর রাতে পার্টিতে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা ১৭ বছরের এক তরুণী গুলিতে নিহত হয়। এর কিছুক্ষণ পর শতাধিক মানুষের অপর একটি হাউস পার্টিতে রাস্তায় চালানো গুলিতে ২০ বছরের এক তরুণ নিহত হন।
মিসিসিপি ও উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া: মিসিসিপির জ্যাকসন শহরের এক নাইট ক্লাবে বন্দুক হামলায় ২ জন নিহত ও ৪ জন আহত হন। অন্যদিকে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় পোশাকের দোকানে ঢুকে এক বন্দুকধারীর চালানো গুলিতে ৪ সন্তানের অন্তঃসত্ত্বা এক মা নিহত এবং ২ কিশোরসহ ৬ জন গুরুতর আহত হন।
ওকলাহোমা: ওকলাহোমা সিটির একটি ট্রেলার পার্কে পার্টির সময় গোলাগুলিতে একজন আহত এবং সেখানে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পিষ্ট হয়ে ২ জনের মৃত্যু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আশপাশে গুলিবর্ষণ
উৎসবের দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আয়োজিত অনুষ্ঠানের আশপাশ এলাকাগুলোতে দুই ডজনের বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হন।
আলাবামার বার্মিংহামে ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল ম্যাচ শেষে লিজিয়ন ফিল্ড স্টেডিয়ামের বাইরে হামলায় ১ জন নিহত ও ৮ জন আহত হন।
ইলিনয়ের ব্লুমিংটনে ‘ইলিনয় ওয়েসলিয়ান ইউনিভার্সিটি’ ক্যাম্পাসের কাছে গুলিতে ১৯ বছর বয়সি এক তরুণী নিহত ও ৭ জন আহত হন।
ইন্ডিয়ানার ব্লুমিংটনে ‘ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি’র হোমকামিং উৎসব ও হ্যালোইন উদ্যাপন চলাকালে ভিড়ের মধ্যে নির্বিচারে চালানো গুলিতে ৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ডালাসে ৭৫ মিনিটে ৩ দফা হামলা
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় টেক্সাসের ডালাস শহরের ডিপ এলাম এলাকায়। রোববার (১ নভেম্বর) ভোরে মাত্র ৭৫ মিনিটের ব্যবধানে তিনটি পৃথক বন্দুক হামলায় অন্তত ৪ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে উৎসবে আসা আতঙ্কিত মানুষকে জীবন বাঁচাতে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। ডালাস পুলিশ প্রধান ড্যানিয়েল কোমো চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “উৎসব ঘিরে আগে থেকেই আমাদের পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। তা সত্ত্বেও এ ধরনের নৈরাজ্য ও প্রাণহানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী অ্যালেক্সিস পিকেরো সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে বলেন, উৎসবের সময় প্রতিটি বার, পার্কিং বা রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করা অসম্ভব। ফলে এই সময়গুলোতে সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা চরম চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়।