৫ বার চিঠি ও ১০ বার বৈঠক করে টিকা সংকটের সতর্কবার্তা দিয়েছিল ইউনিসেফ
বিশেষ প্রতিবেদক: দেশে চলমান ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব ও টিকাসংকট নিয়ে এক বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল (ইউনিসেফ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অন্তত পাঁচটি চিঠি দিয়ে এবং ১০টি পৃথক বৈঠকে সরাসরি সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে টিকা সংকটের কথা বলে আগেভাগেই সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ।
আজ বুধবার (২০ মে) দুপুরে রাজধানীর ইউনিসেফ কার্যালয়ে আয়োজিত এক দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
হামে শিশুমৃত্যু দুঃখজনক, তদন্তকে স্বাগত:
দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই সংবাদ সম্মেলনে রানা ফ্লাওয়ার্স টিকার সংকট, সংকট কাটাতে ইউনিসেফের ভূমিকা এবং ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। হামে ব্যাপক শিশুমৃত্যুর ঘটনাকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ আখ্যা দিয়ে তিনি টিকার সংকট ও শিশুমৃত্যুর ঘটনা তদন্তে বর্তমান সরকারের নেওয়া উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তদন্তে ইউনিসেফ সহায়তা করবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “ইউনিসেফ সব সময় সত্যের পক্ষে।”
তবে বর্তমান পরিস্থিতির ইতিবাচক দিক তুলে ধরে ইউনিসেফ প্রতিনিধি বলেন, “ভালো খবর হচ্ছে, ইতিমধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে এবং বর্তমানে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
দ্রুত টিকা সংগ্রহে ইউনিসেফের পরামর্শ:
সংবাদ সম্মেলনে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, সরকার চাইলে নিজস্ব উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতিতে টিকা ক্রয় করতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, টিকার মজুত সবসময় নিশ্চিত থাকা জরুরি। কারণ, উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে টিকা সংগ্রহ করতে প্রায় এক বছরের মতো সময় লেগে যায়। সে তুলনায় ইউনিসেফের প্রতিষ্ঠিত ও গোছানো চ্যানেলের মাধ্যমে অনেক দ্রুত টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব।
আড়াই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু:
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকাদানে চরম গাফিলতি ও উদাসীনতাই চলতি বছরে এই মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ। সরকারি ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে দেশে হামের প্রকোপ শুরু হয়, যা এখন পর্যন্ত ৬০ হাজারের বেশি মানুষকে আক্রান্ত করেছে— যার সিংহভাগই শিশু। এই মারাত্মক ভাইরাসে ইতিমধ্যে প্রায় ৪৭৫ জন (সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ৪৮১ জন) শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গত আড়াই দশকে হামে এত বিপুল সংক্রমণ বা মৃত্যুর ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। এর আগে ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৯৩৪ জন হাম রোগী পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং গত ২০২৫ সালে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। এমনকি ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরে দেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২,৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭ জন; এবং এই সময়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনাই ছিল না। সেই তুলনায় চলতি বছরের এই পরিসংখ্যানকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি নজিরবিহীন বিপর্যয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।