‘লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাতের ময়দান
নিজস্ব প্রতিবেদক: পবিত্র হজের মূল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোকন আদায়ের লক্ষ্যে সৌদি আরবের মিনার তাঁবু নগরী থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়েছেন লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) ফজরের নামাজ আদায়ের পর থেকেই সমস্বরে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক’ (আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির) ধ্বনি উচ্চারণ করে পুণ্যভূমি আরাফাতের ময়দানে হাজির হচ্ছেন হাজিরা। ইহরামের সেলাইবিহীন শ্বেতশুভ্র পোশাকে আবৃত আল্লাহর মেহমানরা আজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই পবিত্র ময়দানে অবস্থান করে ক্রন্দনরত অবস্থায় মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা ও তাওবা করবেন।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই ধর্মীয় মহাসমাবেশে অংশ নিতে এ বছর সৌদি আরবের বাইরে থেকে ১৫ লাখের বেশি আন্তর্জাতিক হাজি মক্কায় সমবেত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১টি বিশেষ ফ্লাইটে ব্যবস্থাপনা সদস্যসহ মোট ৭৯ হাজার ১৬৪ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী হজের পবিত্র আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিচ্ছেন।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বিদায় হজের স্মৃতি:
চার বর্গমাইল আয়তনের বিশাল আরাফাত ময়দানটি তিন দিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। এই সমতল প্রান্তরের একপ্রান্তেই দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ‘জাবালে রহমত’ বা রহমতের পাহাড়। প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে এই পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়েই মানবজাতির মুক্তির দূত শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনের ঐতিহাসিক ‘বিদায় হজের ভাষণ’ দিয়েছিলেন। হজের নিয়ম অনুযায়ী, আরাফাতের ময়দানে এই নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। এমনকি কোনো হাজি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও সুসজ্জিত লাইফ সাপোর্ট বা বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে এই ময়দানে কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিয়ে আসা হয়।
৩৫ ভাষায় সম্প্রচার ও ৪ বাংলাদেশি অনুবাদক:
আজ আরাফাতের ময়দানের কেন্দ্রীয় ‘মসজিদে নামিরা’ থেকে হজের বিশেষ খুতবা প্রদান করবেন মদিনা মোনাওয়ারার সম্মানিত ইমাম ও খতিব শেখ আলী বিন আবদুর রহমান হুজাইফি। খুতবা শেষে তিনি একই সাথে জোহর ও আসরের নামাজে ইমামতির দায়িত্ব পালন করবেন। বিশ্বব্যাপী এই বাণীর বার্তা পৌঁছে দিতে এ বছর হজের খুতবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি ৩৫টি ভাষায় অনুবাদ করে সম্প্রচার করা হচ্ছে। গর্বের বিষয় হলো, মক্কার বিখ্যাত উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটির চারজন উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশি গবেষক—ড. মুহাম্মদ খলীলুর রহমান, ড. আ ফ ম ওয়াহিদুর রহমান, মুবিনুর রহমান ফারুক এবং নাজমুস সাকিব এবার বাংলা অনুবাদ ও উপস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
মুজদালিফা অভিমুখে যাত্রা ও হজের পরবর্তী ধাপসমূহ:
আজ মঙ্গলবার সূর্যাস্তের পরপরই হাজিরা আরাফাত থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘মুজদালিফা’র উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করে মহান আল্লাহর জিকির-আসকার করবেন এবং আগামীকাল বুধবারের বিশেষ আচারের জন্য ছোট ছোট নুড়ি পাথর সংগ্রহ করবেন।
আগামীকাল বুধবার (২৭ মে) সকালে মুজদালিফা থেকে হাজিরা পুনরায় মিনায় ফিরবেন এবং ‘জামারাত’-এ গিয়ে শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করবেন। পাথর নিক্ষেপ শেষে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হাজিরা পশু কোরবানি করবেন, যা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মৃতি বহন করে। এরপর পুরুষরা মাথা মুণ্ডন বা চুল ছেঁটে এবং নারীরা চুলের অগ্রভাগ কেটে ইহরাম ভঙ্গ করবেন। পরবর্তী ধাপে মক্কায় ফিরে কাবার মূল তাওয়াফ ও সাঈ সম্পন্ন করে আগামী বৃহস্পতি ও শুক্রবার মিনার স্তম্ভগুলোতে পুনরায় পাথর নিক্ষেপ শেষে বিদায়ী তাওয়াফের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে ২০২৬ সালের পবিত্র হজের পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিকতা।