শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
নিজস্ব প্রতিবেদক: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অবিস্মরণীয় প্রতীক শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের ৮০৯ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ও পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। আজ রোববার (১৪ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, এই ঐতিহাসিক রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিতে সাক্ষ্য-প্রমাণের চুলচেরা মূল্যায়ন, আইনগত ও বিচারিক বিশ্লেষণ এবং সমগ্র বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায়সঙ্গতা নিয়ে অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুনিপুণ আলোচনা করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়, জুলাই-আগস্টে দেশজুড়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ধারাবাহিকতায় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডটি ছিল প্রথম ধাপের অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও টার্নিং পয়েন্ট।
স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিচার:
ট্রাইব্যুনাল থেকে আরও জানানো হয়, সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করে এই মামলার পুরো বিচারকার্য অত্যন্ত স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে পরিচালনা করা হয়েছে। এই যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন ও কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে বলেও ট্রাইব্যুনাল দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন।
গত এপ্রিলে ঘোষিত রায়ের সাজা বিশ্লেষণ:
উল্লেখ্য, এর আগে গত ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিচারিক প্যানেল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য (ভিসি) ড. হাসিবুর রশীদসহ মোট ৩০ জন আসামির বিরুদ্ধে এই মামলার সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেছিলেন।
ঘোষিত ওই রায়ে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়:
মৃত্যুদণ্ড: মামলার প্রধান ও সরাসরি জড়িত ২ জন আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
যাবজ্জীবন: অপরাধে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও নির্দেশনার দায়ে ৩ জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
১০ বছরের কারাদণ্ড: বিশেষ অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতার কারণে ৫ জন আসামিকে ১০ বছর মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
৫ বছরের কারাদণ্ড: হামলায় পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অপরাধে ৮ জন আসামিকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
৩ বছরের কারাদণ্ড: সাবেক ভিসি হাসিবুর রশীদসহ অপরাধের ধরন অনুযায়ী ১১ জন আসামিকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
হাজতবাসই সাজা: এছাড়া ১ জন আসামির ক্ষেত্রে তাঁর ইতোমধ্যে খেটে ফেলা দীর্ঘ হাজতবাসের সময়কে সাজার মূল মেয়াদ হিসেবে গণ্য করে, তাঁর দণ্ড ভোগ সম্পন্ন হয়েছে বলে বিবেচনা করে আদালত তাঁকে খালাস বা মুক্তি দেন।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে বুক পেতে দিয়ে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে শহীদ হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ। তাঁর সেই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের ঘটনাই পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে চূড়ান্ত রূপ দেয়। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যার প্রথম বিচারিক নথি সম্পূর্ণ কার্যকর রূপ পেল।