সংসদ ব্যক্তিপূজার জায়গা নয়, এটি দায়িত্ব পালনের জায়গা: বিরোধীদলীয় নেতা
নিউজ ডেস্ক: জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে কোনো ব্যক্তিকে তোষামোদ করার জন্য গান-কবিতা গাওয়ার অতীত ‘ব্যাড কালচার’ বা অপসংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “সংসদ কোনো তোষামোদের জায়গা নয়, এটি দায়িত্ব পালনের জায়গা।” জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা খরচ করে এই পবিত্র সংসদে দাঁড়িয়ে যেন আর কোনো ব্যক্তিপূজা বা চরিত্র হননের কাজ না হয়, স্পিকারের প্রতি সেই জোরালো আহ্বান জানান তিনি।
আজ সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা তাঁর এই গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী বক্তব্য তুলে ধরেন। বাজেটের সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের চেয়ে এর গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক গুরুত্ব ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপরই তিনি বেশি আলোকপাত করেন।
একনজরে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বাজেট বক্তৃতার মূল নির্যাস:
সংসদীয় গণতন্ত্র সচল রাখা, ঐতিহাসিক অবদান স্মরণ এবং বাজেট সংস্কারে তাঁর উত্থাপিত প্রধান দিকসমূহ:
| আলোচনার মূল ক্ষেত্র | ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য ও দর্শন | উত্থাপিত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও দাবি |
| ১. তোষামোদ সংস্কৃতির অবসান | সংসদকে ব্যক্তিপূজা বা চরিত্র হননের প্ল্যাটফর্ম বানানো যাবে না। | ব্যক্তিকে খুশি করতে গান-কবিতা গাওয়ার ‘ব্যাড কালচার’ পুরোপুরি বন্ধের দাবি। |
| ২. অর্থবছর পরিবর্তন | জুলাই-জুন অর্থবছরের কারণে জুন মাসে তাড়াহুড়ো করে কাজ করায় অপচয় ও লুটপাট হয়। | অর্থবছর জুলাই-জুনের পরিবর্তে ক্যালেন্ডার ইয়ার বা জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার প্রস্তাব। |
| ৩. সংসদের ভারসাম্য | সংসদ মূলত দুটি চাকার ওপর চলে—একটি সরকারি দল এবং অন্যটি বিরোধী দল। | বিরোধী পক্ষকে সম্মান দেওয়া এবং চাকায় পিন মেরে ফুটো করার প্রবণতা বন্ধের আহ্বান। |
| ৪. বিরোধী দলের ভূমিকা | বিরোধী দল চোখ বন্ধ করে সব গিলবে না, আবার স্রেফ বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতাও করবে না। | জনকল্যাণ নিশ্চিতে বিরোধী দল সংসদে একটি তীক্ষ্ণ ‘ওয়াচ ডগ’ বা প্রহরী হিসেবে কাজ করবে। |
| ৫. দলের ঐতিহাসিক ত্যাগ | নিজের দলকে ‘কষ্টে বোকা দল’ হিসেবে বর্ণনা করে জানান, ১১ জন শীর্ষ নেতাকে হারানো হয়েছে। | শহীদদের স্মরণের পাশাপাশি বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের পার্লামেন্ট’ হিসেবে আখ্যা। |
‘চাকায় পিন বা পেরেক মেরে ফুটো করার প্রবণতা বন্ধ করুন’:
বিরোধীদলীয় নেতা সংসদকে একটি সচল যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, সরকারি ও বিরোধী দল হলো এর দুটি চাকা। যেকোনো একটি চাকা অকেজো হয়ে গেলে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রই অচল হয়ে পড়বে। তাই দুই চাকাকেই সচল রাখার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, “সংসদে কুচকুচ করে কাটার পর বাইরে এসে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানোর যে মানসিকতা, সেই বিভাজনের যন্ত্রটি এবার ফেলে দিতে হবে।” তিনি মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী এবং আ স ম আবদুর রবের ঐতিহাসিক অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে ৯০-এর গণআন্দোলন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর এবং সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শহীদ ও ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের বীরদের প্রতি সমবেদনা জানান।
ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বাজেট পেশের জন্য অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ:
স্বল্প সময়ে একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতির ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রীর ২৩৪ পৃষ্ঠার এই বিশাল বাজেট পেশ করাকে ‘গুরুভার ও কষ্টসাধ্য কাজ’ আখ্যা দিয়ে তাকে ধন্যবাদ জানান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, মানুষের প্রয়াস ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, তাই এই বাজেটেও কিছু খুঁত বা ঘাটতি থাকা স্বাভাবিক। তবে সম্পূরক বাজেটের ওপর কাটমোশন অবলীলায় অগ্রাহ্য করার প্রচলিত রেওয়াজের সমালোচনা করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার বিরোধী দল ও সরকারি দলের পক্ষ থেকে আসা যৌক্তিক প্রস্তাবনাগুলো অর্থমন্ত্রী সংশোধিত আকারে গ্রহণ করবেন, যাতে দেশবাসী বোঝে এই আলোচনা কেবল সময়ের অপচয় ছিল না।
বছরের প্রথম ১০ মাসে যেখানে মাত্র ৪২ শতাংশ উন্নয়ন কাজ হয়, সেখানে শেষ ২ মাসে বাকি কাজ করতে গিয়ে অপচয়ের যে দুয়ার উন্মুক্ত হয়, তা রোধে অর্থবছর পরিবর্তনের প্রস্তাবটি দেশের আর্থিক ক্ষতি বহুগুণ হ্রাস করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।