বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করা বিচার বিভাগের ওপর চপেটাঘাত: শিশির মনির
নিজস্ব প্রতিবেদক: পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করার সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে এবং এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য একটি ‘কালো দিন’ (Black day)।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুর পৌনে ২টায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব মোবারক হোসাইন এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মু. আতাউর রহমান সরকার।
আস্থার জায়গা ধ্বংসের অভিযোগ:
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, “বিগত সময়ে বিচার বিভাগীয় সচিবালয়কে বিলুপ্ত করার মাধ্যমে বিচার বিভাগের ওপর মূলত একটি চপেটাঘাত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয়ভাবে যে ট্রাস্ট ও কনফিডেন্স তৈরি হয়েছিল, তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। রাতের বা সন্ধ্যার অন্ধকারে আদালত বসিয়ে যাকে ইচ্ছা তাকে সাজা দেওয়ার অভিপ্রায় যদি সরকারের থাকে, তবেই তারা আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাইবে।”
আইনি প্রক্রিয়ার পটভূমি:
আইনি লড়াইয়ের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি জানান, ১৯৯৯ সালে ঐতিহাসিক মাজদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে ২০০৭ সালে বিচার বিভাগকে প্রথম ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে পৃথক করা হয়। পরবর্তীতে ২০expand৫ সালে তাদের দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের ভিত্তিতে ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ হাইকোর্ট বিভাগ ৯০ দিনের মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার রায় দেন। এর প্রেক্ষিতে ৩০ নভেম্বর ২০২৫ সরকার অধ্যাদেশ জারি করে এবং ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু গত ৭ এপ্রিল ২০২৬ বিস্তারিত রায় প্রকাশের পর মাত্র তিন দিনের মাথায় ১০ এপ্রিল ২০২৬ সরকার সেই অধ্যাদেশটি বাতিল ঘোষণা করে।
শিশির মনির আরও বলেন, “সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমরা ১৯ এপ্রিল আরেকটি রিট করি এবং ৫ মে আদালত অবমাননার নোটিশ জারি করি। কিন্তু গত ১৯ মে বিচার বিভাগের সিনিয়র সচিবসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকে আবারও আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করে বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়।”
নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে রাখার সমালোচনা:
জামায়াতের এই আইনজীবী নেতা বলেন, নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের (বিজেএস) মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে হলেও তাদের ছুটি, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাবিষয়ক সবকিছু আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে রেখে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আদেশ গেলে বিচারকদের সুন্দরবন বা বান্দরবানে বদলি করে দেওয়া বা পদোন্নতি না দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হবে, যা স্বাধীন বিচার বিভাগের চরিত্রের সাথে খাপ খায় না।
প্রধান বিচারপতির ক্ষমতা খর্ব করার অভিযোগ:
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, প্রধান বিচারপতিকে স্বাধীনভাবে ৫০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদনের যে আর্থিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, সেটিও আইনটির মাধ্যমে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রতি ৭৮ হাজার মানুষের জন্য মাত্র একজন বিচারক রয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধির যে পদক্ষেপ নিয়েছিল, সচিবালয় বাতিলের ফলে সেই ক্ষমতাও হাতছাড়া হলো। এখন আইন মন্ত্রণালয় তাদের ইচ্ছামতো নিয়োগ ও সংখ্যা নির্ধারণ করবে, যেখানে প্রধান বিচারপতির আর কোনো এখতিয়ার নেই।
জামায়াতে ইসলামী স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা সর্বদা স্বাধীন বিচার বিভাগের পক্ষে এবং জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় অবিলম্বে পুনর্বহাল করা অত্যন্ত জরুরি। সংবাদ সম্মেলনের শেষ অংশে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ সমসাময়িক রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন।