আরাফাতের ময়দান থেকে হজের খুতবা: তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম ঐক্যের ডাক
নিজস্ব প্রতিবেদক: পবিত্র হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় মহাসমাবেশ আরাফাত ময়দানের ঐতিহাসিক ‘মসজিদে নামিরাহ’ থেকে বিশ্ব মুসলিমের উদ্দেশ্যে হজের মূল খুতবা প্রদান করেছেন মসজিদে নববির প্রখ্যাত ইমাম ও খতিব শেখ আলী বিন আবদুর রহমান হুজাইফি। আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) স্থানীয় সময় (সৌদি আরব) দুপুর এবং বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ১৮ মিনিট থেকে শুরু হওয়া এই তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক খুতবাটি টানা ১৫ মিনিট ব্যাপী বিশ্বজুড়ে একযোগে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। মূল আরবি ভাষায় দেওয়া এই যুগান্তকারী খুতবায় বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহীদ প্রতিষ্ঠা, হজের পবিত্রতা রক্ষা, শৃঙ্খলার গুরুত্ব এবং সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের নানা বিষয়ে অত্যন্ত জরুরি দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক এই খুতবার মূল ও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
১. অবাধ্যতার পরিণতি ও হজের চিরন্তন আহ্বান:
খুতবার প্রারম্ভেই মহান আল্লাহ তাআলার অসীম ক্ষমতা, রাজত্ব ও মহিমা ঘোষণা করে পবিত্র কোরআনের বেশ কিছু আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। যেখানে মানব ইতিহাসের পূর্ববর্তী জালিম, অহংকারী ও পাপাচারী জনপদগুলোর করুণ ধ্বংসের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বর্তমান বিশ্বকে আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপাচার থেকে দূরে থাকার কঠোর আহ্বান জানানো হয়। এরপর খুতবায় ইসলামের আদি পিতা ও আল্লাহর বন্ধু হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে দেওয়া মহান আল্লাহর সেই নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়, যার মাধ্যমে তিনি মানবজাতিকে হজের আহ্বান জানিয়েছিলেন; যেন পৃথিবীর দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আল্লাহর ঘরে এসে ইবাদতের মাধ্যমে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি লাভ করতে পারে।
২. তাওহীদের ঘোষণা ও হজে রাজনৈতিক স্লোগান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ:
খতিব শেখ আলী বিন আবদুর রহমান হুজাইফি তাঁর খুতবায় অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, “বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখো হাজি নিজেদের ভাষা, বর্ণ ও দেশের সীমানা পেরিয়ে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মাগফিরাত লাভের আশায় পবিত্র মক্কায় সমবেত হয়েছেন। হজের মূল ও প্রধান উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর একত্ববাদ তথা তাওহীদকে হৃদয়ে ধারণ করা এবং সব ধরনের শিরকের অন্ধকার বর্জন করা।” তিনি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হজের এই পরম পবিত্র আবহকে সব ধরনের ঝগড়া-বিবাদ, গিবত, অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে হবে। বিশেষ করে, পবিত্র হজের ময়দানে কোনো অবস্থাতেই কোনো ধরনের রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া, দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন বা গোষ্ঠীগত আহ্বান জানানো যাবে না। হজ হলো সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর দরবারে নিজেকে সঁপে দেওয়া, বিনয় প্রকাশ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসরণ।
৩. ভ্রাতৃত্বের বন্ধন, ইহসান ও নামাজ আদায়:
খুতবায় বলা হয়, আরাফাতের ময়দান হলো বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন। এখানে হাজিদের নিজেদের আচার-আচরণে ‘ইহসান’ বা সর্বোত্তম ও কোমল ব্যবহার ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি মিথ্যা কথা ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক এই দিনটির গুরুত্ব বোঝাতে খতিব স্মরণ করিয়ে দেন, এই আরাফাতের দিনেই আল্লাহ তাআলা দ্বীন ইসলামকে মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ করার এবং মুসলিমদের ওপর নেয়ামত সম্পূর্ণ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। খুতবা শেষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহর আলোকেই হাজিদের জোহর ও আসরের নামাজ একই সাথে (কছর ও জমা করে) আদায়ের নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত একাগ্রচিত্তে জিকিরে মগ্ন থাকার আহ্বান জানানো হয়।
৪. হজের পরবর্তী ধাপ ও ধাক্কাধাক্কি না করার নির্দেশ:
খুতবায় হাজিদের হজের পরবর্তী ধাপসমূহ অর্থাৎ—সূর্যাস্তের পর মুজদালিফায় গমন, পরবর্তী দিনগুলোতে মিনায় গিয়ে শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ, কোরবানি সম্পন্ন করা, মাথা মুণ্ডন এবং কাবা শরিফে বিদায়ী তাওয়াফ করার হুকুমগুলো ক্রমানুসারে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এই সমস্ত আচার পালনের সময় হাজিদের সম্পূর্ণ শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে, তাড়াহুড়ো বা একে অপরকে ধাক্কাধাক্কি করা থেকে বিরত থাকতে এবং সৌদি আরবের শৃঙ্খলা রক্ষা কর্তৃপক্ষের দেওয়া রুট ম্যাপ কঠোরভাবে মেনে চলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে যেকোনো ধরনের বড় দুর্ঘটনা বা বিশৃঙ্খলা এড়ানো যায়। খুতবায় এই পুণ্যময় দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো তাওহীদের শ্রেষ্ঠ দোয়াটি বেশি বেশি পড়ার তাগিদ দেওয়া হয়।
৫. বিশ্ব উম্মাহর জন্য বিশেষ মোনাজাত:
খুতবার শেষভাগে খতিব বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি, কল্যাণ এবং সত্যের ওপর মুসলমানদের সুদৃঢ় ঐক্য কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। একই সাথে মক্কা ও মদিনার পবিত্র দুই মসজিদের খাদেম সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের দীর্ঘায়ু ও সফলতা কামনা করা হয়। খুতবা সমাপ্ত হওয়ার পরপরই জামাতে নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে পবিত্র আরাফাত ময়দানে আজান ধ্বনিত হয় এবং লাখো হাজি এক ইমামের পেছনে নামাজে সমবেত হন।