অফসাইড বিতর্কের অবসান? বিশ্বকাপ শুরুর ৭ দিন আগে নতুন প্রযুক্তির ঘোষণা ফিফার
ক্রীড়া প্রতিবেদক: ফুটবল মাঠে অফসাইডের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক ও উত্তেজনার ইতিহাস বহু পুরনো। হাইভোল্টেজ সব ম্যাচে অফসাইডের একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রায়শই খেলোয়াড়, কোচ এবং কোটি কোটি সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বাকবিতণ্ডা দেখা যায়। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর (VAR) প্রযুক্তি চালু হওয়ার পর রেফারিদের ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার হার অনেকটাই কমেছে, বিশেষ করে অফসাইডের ক্ষেত্রে এর সুফল মিলেছে হাতেনাতে। তবুও ফুটবলকে শতভাগ নির্ভুল ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। বহুল প্রতীক্ষিত ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) শুরু হতে আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। তার আগেই মাঠের অফসাইড নিখুঁতভাবে ধরার জন্য আরও আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিল ফিফা।
কাতার বিশ্বকাপের প্রযুক্তির সফল যাত্রা:
এর আগে ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি বা ‘এসএওটি’ (SAOT) ব্যবহার করা হয়েছিল। এই প্রযুক্তির কল্যাণে অফসাইডের সিদ্ধান্ত অনেক দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কাতার বিশ্বকাপে মাঠের চারপাশে বসানো একাধিক বিশেষ ক্যামেরা সারাক্ষণ খেলোয়াড়দের প্রতি মুহূর্তের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করত। পাশাপাশি ম্যাচের মূল বলের ভেতরে থাকা একটি অত্যাধুনিক সেন্সর বলটি ঠিক কখন পাস করা হয়েছে, তার সূক্ষ্ম তথ্য পাঠাত কন্ট্রোল রুমে। এই দুই তথ্য একসঙ্গে সমন্বয় করে খুব দ্রুত ও নির্ভুলভাবে অফসাইড শনাক্ত করা হতো।
২০২৬ বিশ্বকাপে আসছে আরও উন্নত এআই সংস্করণ:
আগামী সপ্তাহে শুরু হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপে এই প্রযুক্তির আরও এক ধাপ উন্নত সংস্করণ ব্যবহার করতে যাচ্ছে ফিফা। নতুন এই সংস্করণে আরও আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং চোখের পলকে তথ্য বিশ্লেষণের (ডেটা অ্যানালাইসিস) সুবিধা যোগ করা হয়েছে। নতুন এই প্রযুক্তি মাঠে প্রতি সেকেন্ডে একাধিকবার প্রতিটি খেলোয়াড়ের শরীরের নিখুঁত অবস্থানের তথ্য সংগ্রহ করবে। এর ফলে মাঠে কোনো সম্ভাব্য অফসাইড পরিস্থিতি তৈরি হওয়া মাত্রই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) দলের কাছে অ্যালার্ট বা সতর্কবার্তা পাঠাবে। এরপর ভিএআর কর্মকর্তারা সেই সিদ্ধান্ত দ্রুত পরীক্ষা করে মাঠের মূল রেফারিকে জানিয়ে দেবেন। এর ফলে রেফারিদের আগের মতো বারবার বিভিন্ন ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ও স্লো-মোশন দৃশ্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে সময় নষ্ট করতে হবে না। প্রযুক্তির এই স্বয়ংক্রিয় অগ্রিম কাজের ফলে অফসাইডের সিদ্ধান্ত নিতে আগের চেয়ে অনেক কম সময় লাগবে।
মাঠের বড় পর্দায় গ্রাফিক্সের মাধ্যমে সব দেখতে পাবেন সমর্থকরা:
ফিফা চাইছে শুধু দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই নয়, বরং মাঠের বা টেলিভিশনের দর্শকরাও যেন বুঝতে পারেন সিদ্ধান্তটি কেন এবং কীভাবে নেওয়া হলো। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠের বিশাল জায়ান্ট স্ক্রিন এবং টেলিভিশন সম্প্রচারে অফসাইড সিদ্ধান্তের ত্রিমাত্রিক (3D) ও বিস্তারিত অ্যানিমেশন ছবি ও গ্রাফিক্স লাইভ দেখানো হবে। এর ফলে মাঠে উপস্থিত এবং টিভির সামনে থাকা সমর্থকেরা পরিষ্কারভাবে দেখতে পারবেন কোনো খেলোয়াড় ঠিক কতটুকু অফসাইড পজিশনে ছিলেন। এতে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে সমর্থকদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি ও অহেতুক বিতর্ক অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছে ফিফা।
আমেরিকা, কানাডা এবং মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে এবারই প্রথম রেকর্ড ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের এই মহোৎসব। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ফুটবল মহাযজ্ঞে প্রতিটি ম্যাচকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও বিতর্কহীন রাখতে ফিফার এই উন্নত ‘এআই ট্র্যাকিং’ প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।