আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলা: ১১ শিশুসহ নিহত ১৩
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে প্রতিবেশী আফগানিস্তানের তিনটি কৌশলগত প্রদেশে আকস্মিক ও ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই সামরিক অভিযানে ১১ জন নিষ্পাপ শিশুসহ অন্তত ১৩ জন আফগান নাগরিক নিহত হয়েছেন।
আজ বুধবার (১০ জুন) আফগান তালেবান সরকারের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে এই খবর নিশ্চিত করেছেন। এই হামলার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত সংঘাত ও ভূ-রাজনীতি এবার নতুন এবং আরও বিপজ্জনক মোড় নিল।
বেসামরিক ঘরবাড়িতে বোমাবর্ষণ, আহত ১৪ নারী ও শিশু:
তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি লঙ্ঘন করে আফগানিস্তানের আকাশসীমা সুনির্দিষ্টভাবে ভেদ করেছে। পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানগুলো দেশটির কুনার, খোস্ত এবং পাক্তিকা প্রদেশের সাধারণ বেসামরিক মানুষের ঘরবাড়ি লক্ষ্য করে নির্বিচারে বোমা হামলা চালায়।
মুজাহিদ আরও জানান, এই কাপুরুষোচিত হামলায় আরও অন্তত ১৪ জন গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের সবাই নিরীহ শিশু ও নারী। হতাহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
লড়াকুদের আস্তানা ধ্বংসের দাবি পাকিস্তানের:
আফগান ভূখণ্ডে এই রক্তক্ষয়ী হামলার বিষয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বা দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অফিশিয়ালি কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইসলামাবাদ মূলত আফগানিস্তানের এমন সব দুর্গম জায়গায় নিখুঁত বিমান হামলা চালিয়েছে, যেগুলোকে তারা ‘সশস্ত্র লড়াকুদের আস্তানা ও সন্ত্রাসী স্থাপনা’ বলে চিহ্নিত করেছে। ওই আস্তানাগুলো দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে এবং রাষ্ট্রবিরোধী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, কাবুলভিত্তিক তালেবান সরকার এমন সব সশস্ত্র যোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে, যারা প্রতিনিয়ত পাকিস্তানের মাটিতে বড় ধরনের হামলার ব্লুপ্রিন্ট ও ষড়যোজন তৈরি করছে। তবে তালেবান প্রশাসন ইসলামাবাদের এই অভিযোগ শুরু থেকেই সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আসছে। তাদের স্পষ্ট দাবি, পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক সহিংসতা ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’, এর সঙ্গে আফগানিস্তানের কোনো সংযোগ নেই।
ভেঙে পড়ার মুখে চীনের মধ্যস্থতার যুদ্ধবিরতি:
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ সহিংসতা দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের নাজুক যুদ্ধবিরতিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র এই দুই প্রতিবেশী দেশ বর্তমানে একে অপরের তীব্রতম শত্রুতে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দুই দেশ কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সীমান্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গত মার্চ মাসে পরাশক্তি দেশ চীনের সরাসরি মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ও আফগানিস্তান একটি নাজুক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। বেইজিং যখন দুই দেশের মধ্যকার এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই পাকিস্তানের এই আকস্মিক বিমান হামলা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিল।