আদ্-দ্বীনের হাসপাতাল নয়, বাতিল হয়েছে প্যাথলজির লাইসেন্স: দাবি আইনজীবীর
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল নিয়ে এক চরম আইনি জটিলতা ও নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির দাবি করেছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স নয়, বরং হাসপাতালটির প্যাথলজি সেন্টারের লাইসেন্স বাতিল করেছে। সরকারি আদেশে লাইসেন্স নম্বর ভুলের কারণে এই আইনি গলদ তৈরি হয়েছে। আজ শুক্রবার (১২ জুন) সকালে এক ফেসবুক পোস্টে লাইসেন্স বাতিল আদেশের মূল কপি ও লাইসেন্সসমূহ সংযুক্ত করে তিনি এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেন।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের আদেশে অনড় রয়েছে। অধিদপ্তরের দাবি, আদ্-দ্বীন হাসপাতালটি এখন সম্পূর্ণ লাইসেন্সবিহীন এবং সেখানে কোনো রোগীর চিকিৎসা নেওয়া উচিত নয়।
আইনজীবীর আইনি গলদের ব্যাখ্যা:
অ্যাডভোকেট শিশির মনির তাঁর পোস্টে জানান, গত ৪ জুন ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’ অনুযায়ী আদ্-দ্বীন হাসপাতালটিকে একটি কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়। সেই নোটিশে হাসপাতালটির লাইসেন্স নম্বর ‘HSM 4310059’ উল্লেখ করে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল।
শিশির মনিরের তথ্য ও প্রমাণ অনুযায়ী, সরকার আদ্-দ্বীন হাসপাতাল পরিচালনার জন্য পৃথক দুটি লাইসেন্স জারি করেছে। যার মধ্যে ‘HSM 4310058’ নম্বরটি হলো মূল হাসপাতালের লাইসেন্স এবং নোটিশে উল্লিখিত ‘HSM 4310059’ নম্বরটি আসলে প্যাথলজি ল্যাবরেটরির লাইসেন্স।
ফেসবুক পোস্টে উভয় লাইসেন্সের কপি সংযুক্ত করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “কর্তৃপক্ষ (সরকার) কোনটার লাইসেন্স বাতিল করলো, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবে। এটা তাদের অবহেলা নাকি ইচ্ছাকৃত? অবহেলা হলে কেমন ধরনের অবহেলা? বিচারের ভার আপনাদের উপর রইল।”
‘এগুলো করে লাভ হবে না’—অনড় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর:
আইনজীবীর এই প্রকাশ্য দাবির পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমরা আদেশে স্পষ্টতই উল্লেখ করে দিয়েছি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হলো। এগুলো (আইনি ফাঁকফোকর খোঁজা) করে কোনো লাভ হবে না। আমরা আগামীকাল (শনিবার) সশরীরে গিয়ে বিষয়টি দেখবো। আর আদেশে যদি টেকনিক্যাল কোনো সংশোধনের প্রয়োজন হয়, সেটাও পরে করা হবে।”
এর আগে, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস সাংবাদিকদের জানান, হাসপাতালটিকে দেওয়া শোকজ নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ১৯৮২ সালের অর্ডিন্যান্সের ১১(২)(খ) ধারা অনুযায়ী আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়েছে। ফলে হাসপাতালটি এখন সম্পূর্ণ অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন, যেখানে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা নেওয়া উচিত নয়।
৬ নবজাতকের মৃত্যুর জেরে এই ব্যবস্থা:
স্বাস্থ্য অধিদফতরের লাইসেন্স বাতিলের মূল আদেশে বলা হয়েছে, গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের এক ওয়ার্ডে একসঙ্গে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত উচ্চপর্যায়ের এক তদন্ত কমিটির রিপোর্টে হাসপাতালের ওয়ার্ডে তীব্র অক্সিজেন স্বল্পতা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলাকে মৃত্যুর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই হাসপাতালটির লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না—তা জানতে চেয়ে শোকজ করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে সময় বাড়িয়ে পরবর্তীতে ৯ জুন লিখিত জবাব দাখিল করলেও তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি।
তবে অর্ডিন্যান্সের ১২ ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্স বাতিলের এই আদেশ জারির পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সরকারের কাছে এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার আইনি সুযোগ রয়েছে।