বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা ফ্যাসিবাদের দোসরদের হাতে যাবে না চট্টগ্রাম বন্দর: নজরুল ইসলাম
চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর স্থাপনা। বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার যেকোনো উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হলেও জাতীয় স্বার্থ ও দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে কোনো আত্মঘাতী পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা ফ্যাসিবাদের দোসরদের হাতে দেশের এই প্রধান সমুদ্রবন্দরের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার কোনো অপচেষ্টা চট্টগ্রামবাসী মেনে নেবে না।
আজ শুক্রবার (১২ জুন) সকাল ৯টায় নগরীর জামালখানস্থ বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরী আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম।
শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি এস এম লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে সঞ্চালনা করেন মহানগর সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব চৌধুরী।
ব্যক্তিস্বার্থ ও চাঁদাবাজির শ্রমিক রাজনীতি বন্ধের আহ্বান:
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম চট্টগ্রামের বর্তমান শ্রমিক আন্দোলনের কিছু নেতিবাচক দিক তুলে ধরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “চট্টগ্রামে স্বার্থকেন্দ্রিক শ্রমিক নেতৃত্বের বিকাশ বর্তমানে শ্রমিক আন্দোলনের জন্য বড় সংকট সৃষ্টি করেছে। কিছু অসৎ শ্রমিক নেতার সঙ্গে বিশেষ রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর যোগসাজশের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার দোহাই দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ ও অবৈধ সুবিধা অর্জনের নোংরা রাজনীতি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, মহানগরীতে মাদক, চাঁদাবাজি ও অবৈধ আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা ইদানীং আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি শ্রমিক রাজনীতির আড়ালে এসব অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। আধিপত্যবাদী ও ফ্যাসিবাদী দোসররা নিজেদের স্বার্থে অবৈধ ব্যবসা ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে সাধারণ জনগণের ক্ষতি করছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল এলাকায় কুখ্যাত অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটসহ বিভিন্ন অনিয়মের তীব্র সমালোচনা করে তিনি জনসেবার খাতগুলোকে দ্রুত সিন্ডিকেটমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
টার্মিনাল পরিচালনায় আন্তর্জাতিক দরপত্রের দাবি:
সভাপতির বক্তব্যে শ্রমিক নেতা এস এম লুৎফর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন এবং এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর। এই বন্দরকে ঘিরে কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বা বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা সফল হতে দেওয়া যাবে না। তিনি অবিলম্বে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করার জোর দাবি জানান। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিশেষ সুবিধার ভিত্তিতে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী বলে তিনি উল্লেখ করেন।
লুৎফর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পরও বিভিন্ন সেক্টরে সেই অপশক্তির দোসররা নতুন রূপে সক্রিয় হওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও দুর্নীতির মাধ্যমে শ্রম অধিদপ্তরসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কুক্ষিগত করতে চায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে চক্রান্ত করে ঢাকায় সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
চসিক মেয়রের সমালোচনা ও অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট ভাঙার হুঁশিয়ারি:
বক্তব্যের শেষ অংশে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়রের তীব্র সমালোচনা করে এস এম লুৎফর রহমান বলেন, “বর্তমান মেয়র মেয়াদোত্তীর্ণ। তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য মিডিয়া নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করেন, অথচ চমেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।” তিনি অবিলম্বে এই অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট ভাঙার হুঁশিয়ারি দেন।
চট্টগ্রামকে একটি নিরাপদ, উৎপাদনমুখী ও শ্রমিকবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে অবিলম্বে সব ধরনের চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান নেতৃবৃন্দ। সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম মজুমদার, ফেডারেশনের মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক হামিদুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ মো. নুরুন্নবী, দপ্তর সম্পাদক স. ম শামীম, প্রচার সম্পাদক আব্দুর রহীম মানিক এবং ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ।