মধ্যপ্রাচ্যে নাটকীয় মোড়; ইরানে বিমান হামলা বাতিল করে স্থায়ী চুক্তির ঘোষণা ট্রাম্পের

জুন ১২, ২০২৬ | Feature-2 |

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার মাঝেই আকস্মিক সুরবদল করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের ওপর নতুন করে বড় ধরনের সামরিক ও বিমান হামলা চালানোর পূর্বনির্ধারিত হুমকি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে তেহরানের সঙ্গে একটি স্থায়ী ও ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি (AFP)-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

তবে ওয়াশিংটনের এমন আকস্মিক ও ইতিবাচক দাবির মুখে চুক্তির বিষয়ে ইরানের অবস্থান এখনও অনেকটাই ধোঁয়াশাপূর্ণ ও সতর্ক। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি জানিয়েছেন, তেহরান এখনও এই চুক্তির বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

ইরানে বিমান হামলা বাতিল করলেন ট্রাম্প:

আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এটি উভয় পক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, “আমি আজ সন্ধ্যায় ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছি। চুক্তি স্বাক্ষরের সুনির্দিষ্ট সময় ও স্থান খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।”

ট্রাম্প আরও জানান, সম্ভাব্য এই শান্তি চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রধান আঞ্চলিক মিত্ররা (ইসরায়েলসহ) নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এই মিত্রদের সঙ্গেই যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করেছিল ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তান ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর পর্দার আড়ালের দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতা অবশেষে সফলতার মুখ দেখতে চলেছে। অথচ মাত্র একদিন আগেই ট্রাম্প ইরানে তীব্র হামলার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের ‘খার্গ দ্বীপে’ অবস্থিত ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্রটি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

খামেনির মৃত্যুর পর নতুন নেতৃত্বের সবুজ সংকেত:

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এই ঐতিহাসিক চুক্তি অনুমোদন করেছেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আমি যতটুকু বুঝি, উত্তর হ্যাঁ।”

প্রসঙ্গগত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম তরঙ্গের মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। তেহরানের মেয়রের তথ্যমতে, প্রয়াত নেতার রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া আগামী জুনের শেষ বা জুলাইয়ের শুরুতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

নেতানিয়াহুর কড়া শর্ত ও তসনিম নিউজের সংশয়:

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে দীর্ঘ কথা বলেছেন। ট্রাম্প তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তেহরানের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতা স্মারকে অবশ্যই ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক উপাদান সম্পূর্ণ অপসারণ এবং তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ভেঙে দেওয়ার কড়া শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

তবে ইরানের আধাসামরিক বার্তা সংস্থা ‘তসনিম নিউজ’ ট্রাম্পের এই দাবিকে তীব্র সন্দেহের চোখে দেখছে। তারা উল্লেখ করেছে, গত দুই মাসে ট্রাম্প অন্তত ৩৮ বার ‘চুক্তি চূড়ান্ত’ বলে মিথ্যা ঘোষণা দিয়েছিলেন। তসনিম নিউজ সতর্ক করে বলেছে, যতক্ষণ না ইরান সরকার নিজে কোনো সম্ভাব্য সমঝোতার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করছে, ততক্ষণ ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে তার পূর্ববর্তী ফাঁকা বুলির মতোই গণ্য করা উচিত।

মাঠপর্যায়ে যুদ্ধ ও অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি:

একদিকে যখন ট্রাম্প চুক্তির আশা জাগাচ্ছেন, অন্যদিকে তখনো মাঠপর্যায়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। কুয়েত সরকার জানিয়েছে, ইরান তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি প্রধান রাডার স্টেশন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাময়িকভাবে দেশটির আকাশসীমা বন্ধ করতে হয়েছিল। এর আগে মার্কিন হুমকির জবাবে ইরানের জেনারেল আলী আবদুল্লাহি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, “আমেরিকা হামলা চালালে আগের চেয়েও কঠোর জবাব দেওয়া হবে এবং যুদ্ধের আগুন পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।”

একই সঙ্গে ইরান তাদের কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে নতুন করে কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে। যুদ্ধের শুরু থেকেই বিশ্ববাজারের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি অবরুদ্ধ করে রেখেছে তেহরান। প্রণালিটি তদারকির দায়িত্বে থাকা ইরানের নতুন বিশেষ টাস্কফোর্স স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা ও সাধারণ মানুষের অবিশ্বাস:

আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিমধ্যে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গতকালই বিশ্বব্যাংক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে এমন এক সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়েছে, যা মূলত করোনাকালীন মহামারির পর আর দেখা যায়নি।

শীর্ষ পর্যায়ের এই কূটনৈতিক নাটকীয়তা নিয়ে তেহরানের সাধারণ নাগরিকরাও খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না। মজিদ নামে ৩৫ বছর বয়সী এক ইরানি ফার্মাসিস্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দুই দেশের মধ্যকার আদর্শিক ও রাজনৈতিক ব্যবধান আকাশছোঁয়া। তাই ট্রাম্প মুখে যা-ই বলুক না কেন, বাস্তবে কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি হওয়া নিয়ে আমি মোটেও আশাবাদী নই।”



Leave a Comment