আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯৪৯ সালের এই দিনে (২৩ জুন) পুরানো ঢাকার কে এম দাস লেনের ঐতিহাসিক ‘রোজ গার্ডেন’-এ তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই রাজনৈতিক দলটির জন্ম হয়েছিল। তবে ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় পর, বর্তমানে দলটির সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে।

রোজ গার্ডেন থেকে উত্থানের সূচনা:

ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখা যায়, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুনের প্রথম কাউন্সিলে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি এবং শামসুল হককে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। দল গঠনের সময় তৎকালীন তরুণ ও উদীয়মান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। তবে বন্দি অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও দলের প্রতি তাঁর ত্যাগ ও নেতৃত্ব বিবেচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে প্রথম কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয় তাঁকে।

একনজরে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক রূপান্তর ও শীর্ষ নেতৃত্ব:
দলটির জন্ম থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রধান প্রধান সাংগঠনিক ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:

১৯৪৯ (প্রথম কাউন্সিল): পুরানো ঢাকার রোজ গার্ডেনে জন্ম। মওলানা ভাসানী (সভাপতি), শামসুল হক (সাধারণ সম্পাদক) ও শেখ মুজিবুর রহমান (যুগ্ম সম্পাদক)।

১৯৫৩ (দ্বিতীয় কাউন্সিল): ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত কাউন্সেলে মওলানা ভাসানী সভাপতি পুনর্নির্বাচিত হন এবং শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবারের মতো দলের সাধারণ সম্পাদক হন।

১৯৫৫ (তৃতীয় কাউন্সিল): সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চরিত্র ধারণের লক্ষ্যে দলটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়। স্বাধীনতার পর যা ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ নাম নেয়।

১৯৬৬ (ছয় দফা প্রাক্কাল): ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ ঘোষণার প্রাক্কালে ১৯৬৬ সালের ১ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবার আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৮১ (পরবর্তী অধ্যায়): ১৯৮১ সালের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দলটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নিষেধাজ্ঞা:
বিগত ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রয়েছে। দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে যেকোনো ধরনের বেআইনি মিছিল, ঝটিকা শোডাউন ও নাশকতার আশঙ্কায় গতকালই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ৬টি জেলায় ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। একই সাথে পুলিশ সদর দফতর থেকে দেশজুড়ে জারি রয়েছে বিশেষ সতর্কতা।

ইতিহাসের মোড় ঘোরানো দল:

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ এ দেশের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। তবে টানা ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পর গণ-অভ্যুত্থানে পতন, জুলাই-আগস্টের গণহত্যা বিতর্ক এবং পরবর্তীতে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নজিরবিহীন এক পরিস্থিতিতে দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনটি অতিবাহিত হচ্ছে।



Leave a Comment