চীনের জুতা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত অন্তত ২৮

July 9, 2026 | Feature-2 |

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চীনের পূর্বাঞ্চলীয় ফুজিয়ান প্রদেশের শিল্পনগরী জিনজিয়াং শহরের একটি বৃহৎ জুতা উৎপাদন কারখানায় এক প্রলয়ঙ্কারী ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ২৮ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরের দিকে এই আকস্মিক ও লোহমর্ষক অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। কারখানার দাহ্য পদার্থে আগুন লাগার পর তা মুহূর্তের মধ্যে পুরো বহুতল ভবনে ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক ঘণ্টার হাড়ভাঙা চেষ্টার পর দমকল বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে বলে তীব্র আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা শিনহুয়া ও হংকংভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের যৌথ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৪ মিনিটে জিনজিয়াংয়ের চেনদাই টাউনশিপের অন্তর্গত জিয়াংতোউ গ্রামের কাইতুও রোড ইস্টে অবস্থিত ‘হুইতেং শুজ’ নামক কারখানায় এই ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত ঘটে। কারখানার ভেতরে থাকা বিপুল পরিমাণ রাবার, আঠা ও প্লাস্টিকের মতো কেমিক্যালের কারণে আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

খবর পেয়ে ছুয়ানঝৌ শহরের ফায়ার সার্ভিসের ১৮৩ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দমকলকর্মী এবং ৩৫টি বিশেষ ফায়ার ট্রাক দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জীবন বাজি রেখে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার মরণপণ প্রচেষ্টার পর প্রধান আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও কারখানার ভেতরে ও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে তল্লাশি অভিযান রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

অগ্নিকাণ্ডের সময়কার বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ও শিউরে ওঠার মতো ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, বিশাল কারখানাজুড়ে আগুনের লেলিহান শিখা গলগল করে জ্বলছে এবং ঘন কালো বিষাক্ত ধোঁয়ায় পুরো আকাশ অন্ধকার হয়ে পড়েছে। এ সময় বাঁচার আকুতি নিয়ে কারখানার বেশ কয়েকজন অসহায় কর্মী বহুতল ভবনের ছাদে আটকে পড়ে হাত নেড়ে ও কাপড়ের টুকরো উড়িয়ে সাহায্যের জন্য ব্যাকুল সংকেত দিচ্ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাদ থেকে অবরুদ্ধ ও ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকা কর্মীদের দ্রুত উদ্ধারকাজে কারখানার ওপর একটি বিশেষ উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারও মোতায়েন করা হয়েছিল, যা অনেককে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে।

এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির খবর পাওয়া মাত্রই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কারখানায় আটকে পড়াদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা, দগ্ধ ও আহতদের সরকারি খরচে দ্রুত আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কঠোর নির্দেশ দেন। তিনি কালবিলম্ব না করে এই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে কারখানার মালিকপক্ষ বা সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ প্রদান করেছেন।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আরও বলেন, চলতি বছরজুড়েই চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক বড় ধরনের শিল্প দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের শিল্প খাতের নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। তাই দেশের সব অঞ্চল, প্রদেশ ও সংশ্লিষ্ট তদারকি বিভাগকে এই হুইতেং কারখানার মর্মান্তিক ঘটনা থেকে কঠোর শিক্ষা নিয়ে প্রতিটি কলকারখানার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো আগেভাগেই চিহ্নিত ও তা দ্রুত দূর করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন মর্মন্তুদ ও বেদনাবিধুর দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি পুরোপুরি এড়ানো যায়। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংও পৃথক এক জরুরি নির্দেশনায় দ্রুত উদ্ধার অভিযান, ক্ষতিগ্রস্ত ও নিহতদের পরিবারকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড রোধে দেশের সকল অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানান।

বেইজিংয়ের নির্দেশে চীনের জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন যৌথভাবে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ তদন্ত ও উদ্ধার দল ইতিমধ্যেই দুর্ঘটনাস্থল জিনজিয়াংয়ে পাঠিয়েছে। উল্লেখ্য, চীনের এই চেনদাই অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জুতা উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। এখানকার হাজারো কারখানা থেকে বছরে ১০০ কোটিরও বেশি জোড়া উন্নত মানের স্পোর্টস বা ক্রীড়া জুতা বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা হয় এবং পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বের মোট উৎপাদিত অ্যাথলেটিক জুতার প্রায় প্রতি পাঁচ জোড়ার একটি এই জিনজিয়াং অঞ্চলেই তৈরি হয়, যা আজ এক শোকের উপত্যকায় পরিণত হলো।



Leave a Comment