কুয়েত বিমানবন্দরে ইরানের ভয়াবহ ড্রোন হামলা, নিহত ১ আহত ৬০
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনার পারদ আরও উসকে দিয়ে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং ৬০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কুয়েতের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। হামলার পর পুরো বিমানবন্দর এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং ফ্লাইট চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
আজ বুধবার (৩ জুন) চালানো এই হামলাটিকে একটি ‘অপরাধমূলক ইরানি আগ্রাসন’ বলে তীব্র নিন্দা ও উল্লেখ করেছেন কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র। একই সঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ড্রোন হামলায় বিমানবন্দরের কাছাকাছি থাকা কয়েকটি কূটনৈতিক মিশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হামলার দায় স্বীকার আইআরজিসির, মার্কিন হামলার প্রতিশোধ:
এদিকে কুয়েত বিমানবন্দরে এই হামলার দায় সরাসরি স্বীকার করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সম্প্রতি ইরানের একটি তেলবাহী জাহাজ এবং কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলার সুনির্দিষ্ট প্রতিশোধ হিসেবেই এই ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।
এর আগে, গত মঙ্গলবার (২ জুন) রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছিল, তারা আত্মরক্ষামূলক অভিযান চালিয়ে ইরানের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় হামলা করেছে, যার মধ্যে কেশম দ্বীপের একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনও রয়েছে। সেন্টকম আরও জানায়, তারা বেসামরিক জাহাজের দিকে ধেয়ে যাওয়া তিনটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ইরান কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করেছিল, যার বেশিরভাগই আকাশে প্রতিহত করা হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বোতসোয়ানা-নিবন্ধিত একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করেও হামলা চালায়, যা ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইরানি কূটনীতিকদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ:
বিমানবন্ধরে এই নজিরবিহীন হামলার পর কুয়েত সরকার অত্যন্ত কঠোর ও দ্রুত কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কুয়েত প্রশাসন তেহরানের চার্জ দ্য’অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে আনুষ্ঠানিক কড়া প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি দুই ইরানি কূটনীতিককে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।
নিহত ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক, দিল্লির নিন্দা:
কুয়েত কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, হামলায় নিহত ব্যক্তি একজন ভারতীয় নাগরিক। এই ঘটনায় এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। হামলায় আরও কয়েকজন ভারতীয় নাগরিক আহত হয়েছেন জানিয়ে দিল্লি বলেছে, তারা কুয়েতের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
যুদ্ধবিরতি আলোচনা অনিশ্চয়তায়, বিশ্ববাজারে উদ্বেগের ছায়া:
পাল্টা বিবৃতিতে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, তারা মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনায় এই পাল্টা হামলা চালিয়েছে এবং ভবিষ্যতে মার্কিন উসকানির আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রকে ভারী মূল্য দিতে হবে বলেও হুমকি দেয় তেহরান।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি আলোচনা আবারও গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কুয়েত বিমানবন্দরের এই নতুন সহিংসতা শুধু কুয়েত বা মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং তেলের বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।